Friday, 23 December 2022

ভগবতী শ্রীরাধা ও রাসলীলার আধ্যাত্মিকভাব—

 


বিষ্ণুপুরাণোক্ত "হ্লাদিনী, সন্ধিনী ও সম্বিৎ এই তিন শক্তি ভগবানকে আশ্রয় করিয়া আছেন। তন্মধ্যে হ্লাদিনী প্ৰেম স্বরূপা ; ইনিই রাধা নামে কীৰ্ত্তিতা। যিনি শ্ৰীকৃষ্ণের মন হরণ করেন, তিনিই হরা; কৃষ্ণাহ্লাদস্বরূপিণী রাধাই এই নামে অভিহিত হইয়া থাকেন।

রাধ্ ধাতু হইতে রাধাশব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে। রাধ্ ধাতুর অর্থ সাধনা, পূজা বা তুষ্টকরা। যিনি সাধন করেন, পূজা করেন বা তোষণ করেন,—তিনিই রাধা। আর এই শক্তিকে যিনি আকর্ষণ করেন,—তাঁহার নাম কৃষ্ণ। কৃষ্ ধাতু হইতে কৃষ্ণ শব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে, কৃষ্ ধাতুর অর্থ আকর্ষণ করা ; যিনি সাধনাকারিণী শক্তির সৰ্বেন্দ্ৰিয় আকর্ষণ করেন, তাঁহাকেই কৃষ্ণ বলে। অতএব রাধা ও কৃষ্ণ একই আত্মা। তাঁহারা অগ্নি ও দাহিকাশক্তির ন্যায় ভেদাভেদরূপে নিত্য বৰ্ত্তমান থাকিয়া সমগ্ৰ প্ৰাপঞ্চিক জীব সমূহের অন্তর্বাহ্যে বিরাজ করিতেছেন। তাই শ্ৰীকৃষ্ণ গোপীদিগকে বলিয়াছিলেন

অহং হি সর্বভূতানামাদিরন্তোহন্তরং বহিঃ।

ভৌতিকানাং যথা খং বা ভূর্বায়ুর্জ্যোতি রঙ্গনাঃ৷

-(শ্রীমদ্ভাগবত, ১০ম স্কন্ধ, ৮২ অধ্যায়, ৪৫)

"যেরূপ আকাশ, বায়ু, তেজ, জল ও ক্ষিতি এই পঞ্চমহাভূত, সমুদায় ভৌতিক পদার্থের কারণ ও কাৰ্য্য হইয়া, তাহাদিগের অন্তর্বহিঃ বৰ্ত্তমান রহিয়াছে; তদ্রুপ আমিই একমাত্র সর্বপ্রাণীর কারণ ও কাৰ্য্য বলিয়া, সকলেরই অন্তৰ্ব্বাহ্যে বিরাজ করিতেছি ; সুতরাং আমার সহিত তোমাদিগের বিচ্ছেদ, কদাপি সম্ভবপর নহে।

রাধা আর কৃষ্ণ একই আত্মা; জীবকে প্ৰেমতত্ত্ব আস্বাদন করাইতে ও তৎসাধনা শিক্ষা দিতে ব্রজধামে উভয়দেহ ধারণ করিয়াছিলেন। সেই ব্ৰজলীলা বুঝিতে হইলে সৰ্ব্বাগ্রে ব্রজলীলার আধ্যাত্মিক ভাব হৃদয়ঙ্গম করা কৰ্ত্তব্য ; তাহা হইলে প্ৰাকৃতলীলা সহজেই বোধগম্য হইবে। জীবের সহিত ভগবানের যে ঘনিষ্ট সম্বন্ধ, সে সম্বন্ধ কেবল প্ৰাকৃত স্ত্রীপুরুষের সম্বন্ধ ব্যতীত আর কিছুরই অনুরূপ হইতে পারে না। এজন্য যোগের সেই ঘনিষ্ট সম্বন্ধ হিন্দুঋষি ব্ৰজলীলায় রাধাকৃষ্ণ তত্ত্বে প্ৰকাশ করিয়াছেন। আত্মা যখন সংসারের কুটিলতা ও মায়া হইতে পরিব্রাজিত হয়েন, তখন তাঁহার ব্রজ ভাব ঘটে। তৃণাবৰ্ত্ত, অঘাসুর, বকাসুররূপী হিংসা-কুটিলতা নাশ করিতে না পারিলে ব্ৰজভাব প্ৰাপ্তি হয় না। সেই ব্ৰজভাবে প্ৰকৃতি ব্ৰজেশ্বরী। ব্ৰজেশ্বরীর মিলন আনন্দধাম বৃন্দাবনে। যতদিন না জীবের সংসার বীজ সমুদায় নষ্ট হয়, ততদিন তাহার মুক্তি নাই। সাঙ্খ্য মতে প্ৰকৃতি-পুরুষের ঘনিষ্টতাই জগৎ-সংসার। জগতেই প্ৰকৃতিপুরুষ ঘোর আসক্ত; তাহাদের বিচ্ছেদই মুক্তির সোপান। রাধার শতবৎসর বিচ্ছেদে জীবাত্মার শতবৎসর অনাসক্তিতে মুক্তিলাভ। শতবৎসর পর রাধিকার সহিত কৃষ্ণের মিলন। মিলনে জীবাত্মার মোক্ষপদ। যোগের এই সমস্ত নিগূঢ়তত্ত্ব এক একটী করিয়া, হিন্দু অবয়বী কল্পনায় মূৰ্ত্তিমান করিয়া দেখাইয়াছেন। যোগে জীবাত্মা পরমাত্মতত্ত্বের সহিত যতভাবে রমণ করেন, তাহার অনুভব ও মিলনের যত প্রকার স্তর আছে, তৎসমুদায় কৃষ্ণলীলায় প্রকটিত।

দ্বাপর যুগের শেষ সন্ধ্যায় যখন জীব কৰ্ম্ম ও জ্ঞানের কর্কশ সাধনায় জ্বলিত-কণ্ঠে ভগবানের কৃপাবারির আশায় উৰ্দ্ধমুখে চাহিয়াছিল, বাসনা-বিদগ্ধ হইয়া আনন্দের অনুসন্ধানে ঘুরিতেছিল, ভগবান সেই সময় মনুষ্যের উৰ্দ্ধগতি দানজন্য-পরমানন্দ দানজন্য-পিপাসিতকণ্ঠে মধুর প্ৰেমরসের পূর্ণধারা ঢালিয়া দিবার জন্য হ্লাদিনীশক্তির সহিত রাধাকৃষ্ণরূপে ব্রজধামে অবতীর্ণ হইয়া ছিলেন। জগতের প্রধান ভাব প্ৰেম, সেই প্ৰেমদান করিতে, প্ৰেমশিক্ষা প্ৰদান করিতে, প্ৰেমে জগৎকে জাগাইতে ভগবান্ আপনার হ্লাদিনী শক্তির সহিত বৃন্দাবনে মাধুৰ্য্যের রাসলীলা করিয়াছিলেন। কৃষ্ণ অবতারের উদ্দেশ্যই অপূর্ণ মানবকে প্রেমের আস্বাদন দিয়া, ভগবানের ক্ষরিত প্ৰেমসুধা পান করাইয়া নিবৃত্তির পথে লইয়া যাওয়া। আদর্শ ব্যতীত মানব এক পদও অগ্রসর হইতে পারে না; অপূর্ণ জীব কি কখন পূর্ণানন্দ প্রতিষ্ঠা করিতে পারে?

জীবকে এই আদর্শ দেখাইয়া প্ৰেমভক্তির পথে পূর্ণানন্দ প্ৰদানের জন্যই ব্রজলীলা-ভগবানের “রাধাকৃষ্ণ অবতার। অতএব ব্রজলীলা বা রাধাকৃষ্ণের রতিরস কদৰ্য্য বা ঘূণ্য নহে। ভগবান্ স্ব-স্বরূপেই রমমাণ; তাই তাঁহার নাম আত্মারাম ঈশ্বর। সেই রমণীলীলায় ব্রজলীলা। জীব আর শক্তি লইয়া তাঁহার সকল। জীব আর শক্তি না থাকিলে  তিনি নির্গুণ, নিক্ৰিয়। জীব যখন সাধন বলে নিষ্কামভাবে প্ৰকৃতির বাহুবন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া ভগবানকে আত্মসমর্পণ করে-তখন ভগবানের স্বরূপশক্তি প্রাপ্ত হয়। কিন্তু জীব তখন নিষ্কাম-সে শক্তি লইয়া কি করিবে? তাহার কামনা গিয়াছে, কর্ম গিয়াছে, শক্তির তাহার প্রয়োজন কি? তাই জীব সে শক্তি তাঁহাকেই প্রত্যার্পণ করে। সে শক্তি নিজশক্তি বলিয়া-আনন্দময়ী হ্লাদিনীশক্তি বলিয়া, ভগবান তাহা গ্ৰহণ করিয়া মধুরভাবে আলিঙ্গন করতঃ মিলিত হয়েন। ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য শ্রীজগন্নাথাষ্টকম্ শীর্ষক স্তোত্রে বলিতেছেন"রসানন্দো রাধাসরসবপুরালিঙ্গনসুখো জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে" অর্থাৎ "শ্ৰীরাধিকার রসময় দেহ আলিঙ্গনে সুখী, সেই প্ৰভু জগন্নাথ আমার নয়নপথগামী হউন।"

এইরূপ ভগবান ও ভক্তের স্বরূপগত অভেদাত্মক মিলনের নাম রমণ; যোগীর ইহাই সমাধি। মহাভারতের বিষ্ণুসহস্রনামের ভাষ্যে শঙ্করাচার্য বলিতেছেন "নিত্য আনন্দ স্বরূপ ভগবানের সহিত যোগীজন রমন করেন, সেজন্যই তিনি (বিষ্ণু) রাম। পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে- যে নিত্যানন্দ স্বরূপ চিদাত্মায় যোগীজন রমন করেন সেই পরম ব্রহ্মকে 'রাম' এই নামে বলা হয়ে থাকে।" ভগবান্ ভক্তের সহিত রমণ করিবেন, ভক্তও ভগবানের সহিত রমণ করিবেন। এ রমণ বা মিলন পরস্পরের ইচ্ছায় নহে, স্বাভাবিক। ভগবান এই প্রকারে যে নিজশক্তি বা প্রকৃতির সহিত রমণ করেন, এ রমণ মায়িক জগতের কেহ জানিতে পারে না, —ইহাই ব্রজের অমানুষী গূঢ়লীলা। এই স্বরূপশক্তির শীর্ষ স্থানীয়া হ্লাদিনীশক্তি, সেই আনন্দদায়িনী হ্লাদিনী ভগবানকে আনন্দাস্বাদন করাইয়া থাকেন। হ্লাদিনী শক্তি দ্বারা ভক্তের পোষণ হয়, তজ্জন্য তাঁহার অপর নাম গোপী। শ্ৰীমতী রাধাই গোপীকুলশিরোমণি, তাই রাধার প্রেমও সাধ্যের শিরোমণি। নিরবচ্ছিন্ন আনন্দদায়িনী হ্লাদিনীশক্তি রাধার সহিত, পরমপুরূষ শ্ৰীকৃষ্ণের যে মিলন, তাহাই রমণ বা রাসক্রীড়া নামে অভিহিত। তাই গোপীভাবের সাধনায় শৃঙ্গার রসকে মধ্যগত করতঃ প্রেমিক-প্রেমিকা উভয়ের চিত্ত দ্রবীভূত হইয়া সম্ভোগ-মিলন সংঘটিত হয়, তাহাতে সমস্ত প্রকার ভেদ-ভ্ৰম দুৱীভূত হইয়া যায়। রাসক্রীড়ায় সর্বপ্রকার চিত্তরঞ্জনের দ্বারা গোপীগণের ভক্তি উদ্রিক্তা হইলে, তাহারা কৃষ্ণানুরাগিণী হইয়া আপনাদিগকেই কৃষ্ণ বলিয়া জানিতে লাগিল, কৃষ্ণের কথিতব্য কথা কহিতে লাগিল, এবং কেবল জগদীশ্বরের সৌন্দর্যের অনুরাগিণী হইয়া জীবাত্মা পরমাত্মায় যে অভেদ জ্ঞান, যাহা যোগীর যোগের এবং জ্ঞানীর জ্ঞানের চরমোদ্দেশ্য, তাহা প্রাপ্ত হইয়া ঈশ্বরে বিলীন হইল। বিষ্ণুপুরাণে বর্ণিত আছে এই অভেদ তত্ত্ব। যথা-

"ভগবান কৃষ্ণ অন্যত্র চলিয়া গেলে গোপীগণ কৃষ্ণচেষ্টার অনুকারিণী হইয়া দলে দলে বৃন্দাবনমধ্যে ফিরিয়া বেড়াইতে লাগিল; এবং কৃষ্ণে নিরুদ্ধহৃদয়া হইয়া পরস্পরকে এইরূপ বলিতে লাগিল, ‘আমি কৃষ্ণ, এই ললিতগতিতে গমন করিতেছি, তোমরা আমার গমন অবলোকন কর। অন্যা বলিল, ‘আমি কৃষ্ণ, আমার গান শ্রবণ কর। অপরা বলিল ‘দুষ্ট কালিয়! এইখানে থাক, আমি কৃষ্ণ,’ এবং বাহু আস্ফোটন-পূর্বক কৃষ্ণলীলার অনুকরণ করিল। আর কেহ বলিল, ‘হে গোপগণ! তোমরা নির্ভয়ে এইখানে থাক, বৃথা বৃষ্টির ভয় করিও না, আমি এইখানে গোবর্ধন ধরিয়া আছি। অন্যা কৃষ্ণলীলানুকারিণী গোপী বলিল, ‘এই ধেনুককে আমি নিক্ষিপ্ত করিয়াছি, তোমরা যদৃচ্ছাক্রমে বিচরণ কর। এইরূপে সেই সকল গোপী তৎকালে নানাপ্রকার কৃষ্ণচেষ্টানুবর্তিনী হইয়া ব্যগ্রভাবে রম্য বৃন্দাবন বনে সঞ্চরণ করিতে লাগিল।" -(বিষ্ণুপুরাণ, পঞ্চমাংশ, ত্রয়োদশ অধ্যায়, ২৪-২৯)

রাধাকৃষ্ণই রসতত্ত্ব। যিনি বাক্য ও মনের অগোচর, তিনি ব্ৰহ্ম ; ব্ৰহ্মই আনন্দামৃতরূপ রস। শ্রুতি বলেছেন "রসো বৈ সঃ" (তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২/৭) অর্থাৎ ব্রহ্মই রসস্বরূপ। এই রস আস্বাদনার্থই ভগবানের সৃষ্টিকাৰ্য্য; জীব সেই বাসনাবিদগ্ধ হইয়া, রসের পিপাসু হইয়া, ঘুরিয়া মরিতেছে। গোপীভাবের সাধনায় সেই রস-রতির  জ্ঞান হয়, হৃদয়ে তাহা প্রকাশ পায়। ভগবানের যে রসপ্রাপ্তিকামনা, সেই রস পূর্ণভাবে রাধায় বিরাজিত। সুতরাং রসের বিকাশ রাধাতত্ত্বে। রাধার সহিত শ্ৰীকৃষ্ণের যে ব্রজলীলা তাহাই রসের আশ্রয় বা রস-সাধনা৷ রাধা আর কৃষ্ণ একই আত্মা ; জীবকে রসতত্ত্ব আস্বাদন করাইতে ব্রজধামে উভয় দেহ ধারণ করিয়াছিলেন। সেই রাধাকৃষ্ণ আত্মস্বরূপে অর্থাৎ আত্মারূপে প্ৰতি জীবহৃদয়ে অধিষ্ঠিত আছেন।......

তথ্যসূত্রঃ-

১. ভগবান শঙ্করাচার্যের "বিষ্ণুসহস্রনাম" ভাষ্য।

২. স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতীর "প্রেমিকগুরু" শীর্ষক গ্রন্থ।

...............................................................

শ্রীশুভ চৌধুরী

ডিসেম্বর ১৬, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ।

No comments:

Post a Comment

ভাগবতে অদ্বৈতবেদান্তোক্ত দৃগ্-দৃশ্যবিবেক ও প্রতিবিম্ববাদ—

  সনৎকুমার মোক্ষের সাধন উপদেশ করতে গিয়ে বলছেন — দগ্ধাশয়ো মুক্তসমস্ততদ্গুণো নৈবাত্মনো বহিরন্তর্বিচষ্টে । পরাত্মনোর্যদ্ব্যবধানং...