Friday, 18 November 2022

রামের বিক্রম

 


বিনয় স্বভাবকে যাঁহারা দূর্বলতা ভাবিয়া থাকে তাঁহাদের উদ্দেশ্যে রঘুবীর ভগবান শ্রীরামচন্দ্র বলিতেছেন-'হে লক্ষ্মণ! আমি মৃদুভাব, লোকহিতে রত, সংযতেন্দ্রিয় ও করুণাশীল; সেইজন্য দেবগণ নিশ্চয় আমাকে নির্বীর্য্য মনে করেন। আমার গুণই দোষ হইয়া পড়িয়াছে। দেখ লক্ষণ, জরা, মৃত্যু, কাল ও দৈবকে যেমন কেহ কখনও প্রতিহত করিতে পারে না, সেইরূপ ক্রোধাবিষ্ট আমাকেও কেহ নিবারণ করিতে পারিবে না।'-(বাল্মীকি রামায়ণ, অরণ্যকাণ্ড, ৫৪।৫৫,৭৬)

প্রলয়কালে রুদ্রের ন্যায় লোকসংহারে উদ্যত রামচন্দ্রের অদৃষ্টপূর্ব ক্রুদ্ধ মূর্ত্তি দেখিয়া ভীত লক্ষ্মণ কৃতাঞ্জলি হইয়া রামকে বললিলেন-'আপনি সর্ব্বদা সর্ব্বভূতের হিতকারী, ক্রোধের বশবর্ত্তী হইয়া আপনি স্বীয় স্বভাব বিসর্জ্জন দিবেন না। আপনি শান্ত হউন।'

লক্ষ্মণের বীরবাণী

 


ভীমবাহু রামানুজ লক্ষ্মণ বলিলেন-'যে বিহ্বল বীর্যহীন সে দৈবের অনুসরণ করে। যারা বীর এবং আত্মনির্ভরশীল তারা দৈবের উপাসনা করে না। পুরুষকার দ্বারা দৈবকে যে বাধা দিতে সমর্থ সে দৈবক্রমে অকৃতার্থ হলেও অবসন্ন হয় না। আজ লোকে দৈবের শক্তি ও পুরুষের পৌরুষ দেখবে, আজ দৈব ও মানুষের বলাবল প্রকট হবে। যারা তোমার রাজ্যাভিষেক দৈবকর্তৃক ব্যাহত দেখেছে আজ তারাই সেই দৈবকে আমার পৌরুষে পরাভূত দেখবে।'

-(বাল্মীকি রামায়ণ, অযোধ্যাকাণ্ড, সর্গ ২৩। ১৬-১৯)

শবরীর ইষ্টলাভঃ-

 


বাল্মীকি রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডের সর্গ ৭৪-৭৫ এ বর্ণিত আছে- কবন্ধের প্রদর্শিত পথে যাত্রা করে রাম-লক্ষ্মণ পম্পার পশ্চিম তীরে শবরীর আশ্রমে উপস্থিত হলেন। সিদ্ধা শবরী তাঁদের চরণবন্দনা করে পাদ্য আচমনীয় প্রভৃতি দিয়ে সম্মাণ করলেন।..বৃদ্ধা শবরী শ্রীরামের সম্মুখে এসে উত্তর দিলেন-

অদ্য প্রাপ্তা তপস্সিদ্ধিস্তব সংদর্শনান্ময়া৷

অদ্য মে সফলং তপ্তং গুরবশ্চ সুপূজিতাঃ৷৷

অদ্য মে সফলং জন্ম স্বর্গশ্চৈব ভবিষ্যতি৷

ত্বয়ি দেববরে রাম পূজিতে পুরুষর্ষভ৷৷

চক্ষুষা তব সৌম্যেন পূতাস্মি রঘুনন্দন৷

গমিষ্যাম্যক্ষযান্লোকাংস্ত্বত্প্রসাদাদরিন্দম৷৷-(বাল্মীকি রামায়ণ, অরণ্যকাণ্ড, সর্গ ৭৪। ১১-১৩)

-আজ তোমাকে দেখে আমার তপস্যার সিদ্ধিলাভ হল, আজ আমার জন্ম সফল, গুরুপূজাও সার্থক। হে পুরুষশ্রেষ্ঠ রাম! তুমি দেবগণেরও শ্রেষ্ঠ, আজ তোমার পূজা করে আমার তপস্যার ফলস্বরূপ স্বর্গলাভ হবে৷ রঘুনন্দন! তোমার সৌম্যদৃষ্টিতে আমি পূত হয়েছি। হে অরিন্দম! তোমার প্রসাদে আমি অক্ষয়লোক লাভ করব।

শিবগায়ত্রী

 


কৃষ্ণযজুর্বেদীয় মহানারায়ণ উপনিষদের তৃতীয় খণ্ডে মহাদেবের উদ্দেশ্যে যে মন্ত্রগুলো নিবেদিত তন্মধ্যে দ্বিতীয় মন্ত্রটি রুদ্র গায়ত্রীমন্ত্র হিসেবে প্রসিদ্ধ-

তৎপুরুষস্য বিদ্মহে সহস্রাক্ষস্য মহাদেবস্য ধীমহি।

তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ।।-(মহানারায়াণ উপনিষৎ, তৃতীয়খণ্ড-১)

সেই পুরুষকে (পরব্রহ্মকে) আমরা জানব। সহস্রচক্ষু মহাদেবের ধ্যান করব। সেই ধ্যানে রুদ্র আমাদের প্রেরণা দান করুন।।১

তৎপুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি।

তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ।।-(মহানারায়াণ উপনিষৎ, তৃতীয়খণ্ড-২)

সেই মহান দেবতাকে আমরা জানব। মহাদেবের ধ্যান করব। সেই ধ্যানে রুদ্র আমাদের প্রেরণা দান করুন।।২

তৎপুরুষায় বিদ্মহে নন্দিকেশ্বরায় ধীমহি।

তন্নো বৃষভঃ প্রচোদয়াৎ।।-(মহানারায়াণ উপনিষৎ, তৃতীয়খণ্ড-৩)

সেই পরমপুরুষের স্বরূপ আমরা জানব। নন্দিকেশ্বরের ধ্যান করব। সেই ধ্যানে শক্তিসম্পন্ন দেবতা আমাদের প্রেরণা দান করুন।।৩

.................................................................................... 

শ্রীশুভ চৌধুরী

নভেম্বর ১০, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ।

রাজসূয় যজ্ঞসভায় কাহাকে শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য প্রদান করিব?

 


যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞ আরম্ভ হইল।  যুধিষ্ঠিরের সভার অর্ঘ দিতে হইবেকে ইহার উপযুক্ত পাত্র? ভারতবর্ষীয় সমস্ত রাজগণ সভাস্থ হইয়াছেন, ইহার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কে? ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের এই প্রশ্নের উত্তরে-'ততো ভীষ্মঃ শান্তনবো বুদ্ধ্যা নিশ্চিত্য বীর্য্যবান্। অমন্যত তদা কৃষ্ণমহর্ণীয়তম্ ভূবি।।'-(মহাভারত, সভাপর্ব, ৩৫।২৭)

তারপর বীর্য্যবান শান্তনুনন্দন ভীষ্ম বুদ্ধিদ্বারা নিশ্চয় করিয়া ভূমণ্ডলে শ্রীকৃষ্ণকেই পূজ্যতম ব্যক্তি বলিয়া মনে করিলেন। ভীষ্ম বলিলেন, “কৃষ্ণই তেজঃ বল ও পরাক্রম বিষয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ। ইঁহাকে অর্ঘ প্রদান কর। ইনি জ্যোতিষ্কগণের মধ্যে ভাস্কর সদৃশ। ইঁহার উপস্থিতিতে এই সভা আলোকিত হইয়াছে। ভীষ্ম বলিলেন, “এই মহতী নৃপসভায় একজন মহীপালও দৃষ্ট হয় না, যাহাকে কৃষ্ণ তেজোবলে পরাজয় করেন না। অচ্যুত কেবল আমাদিগের অর্চনীয় এমত নহে, সেই মহাভুজ ত্রিলোকীর পূজনীয়। তিনি যুদ্ধে অসংখ্য ক্ষত্রিয়বর্গের পরাজয় করিয়াছেন, এবং অখণ্ড ব্রহ্মাণ্ড তাঁহাতেই প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। কৃষ্ণ জন্মিয়া অবধি যে সকল কার্য করিয়াছেন, লোকে মৎসন্নিধানে পুনঃ পুনঃ তৎসমুদায় কীর্তন করিয়াছে। তিনি অত্যন্ত বালক হইলেও আমরা তাঁহার পরীক্ষা করিয়া থাকি। কৃষ্ণের শৌর্য, বীর্য, কীর্তি ও বিজয় প্রভৃতি সমস্ত পরিজ্ঞাত হইয়া সেই ভূতসুখাবহ জগদর্চিত অচ্যুতের পূজা বিধান করিয়াছি। কৃষ্ণের পূজ্যতা বিষয়ে দুটি হেতু আছে; তিনি নিখিল বেদবেদাঙ্গপারদর্শী ও সমধিক বলশালী। ফলতঃ মনুষ্যলোকে তাদৃশ বলবান্ এবং বেদবেদাঙ্গসম্পন্ন দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রত্যক্ষ হওয়া সুকঠিন। দান, দাক্ষ্য, শ্রুত, শৌর্য, লজ্জা, কীর্তি, বুদ্ধি, বিনয়, অনুপম শ্রী, ধৈর্য ও সন্তোষ প্রভৃতি সমুদায় গুণাবলী কৃষ্ণে নিয়ত বিরাজিত রহিয়াছে। অতএব সেই সর্বগুণসম্পন্ন আচার্য, পিতা ও গুরুস্বরূপ পূজার্হকৃষ্ণের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন তোমাদের সর্বতোভাবে কর্তব্য তিনি ঋত্বিক্, গুরু, সম্বন্ধী, স্নাতক, রাজা এবং প্রিয়পাত্র। এই নিমিত্ত অচ্যুত অর্চিত হইয়াছেন। কৃষ্ণই এই চরাচর বিশ্বের সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়কর্তা, তিনিই অব্যক্ত প্রকৃতি, সনাতন, কর্তা, এবং সর্বভূতের অধীশ্বর, সুতরাং পরমপূজনীয়, তাহাতে আর সন্দেহ কি? বুদ্ধি, মন, মহত্ত্ব, পৃথিব্যাদি পঞ্চ ভূত, সমুদায়ই একমাত্র কৃষ্ণে প্রতিষ্ঠিত আছে। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, দিক্‌বিদিক্ সমুদায়ই একমাত্র কৃষ্ণে প্রতিষ্ঠিত আছে।

ভীষ্মের অনুমতিক্রমে সহদেব ভগবান শ্রীকৃষ্ণকেই শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য প্রদান করিলেন।

স্বর্গের দ্বার কি?

 


শ্রীমহাভারতে আদিপর্বের নবতিতম অধ্যায়ে যযাতি কহিলেন, “হে অষ্টক! তপস্যা, দান, শম, দম, লজ্জা, সরলতা এবং দয়া এই সাতটি স্বর্গের দ্বার-স্বরূপ। সাধুলোকেরা কহিয়া থাকেন, মনুষ্যেরা অজ্ঞানকূপে মগ্ন হইয়া অহঙ্কারদোষে সর্ব্বদা বিনষ্ট হয়। অধ্যয়নশীল পাণ্ডিত্যাভিমানী যে ব্যক্তি বিদ্যবলে অন্যের যশোলোপ করে, সে পুণ্যলোক হইতে অচিরাৎ ভ্রষ্ট হয় এবং তাহারা সেই অধ্যয়নাদি ব্রহ্মফলপ্রদ হয় না। অগ্নিহোত্র, মৌনব্রত, অধ্যয়ন, যজ্ঞানুষ্ঠান এই চতুর্ব্বিধ কর্ম্ম শুভফলপ্রদ সন্দেহ নাই, কিন্তু দম্ভ-অহঙ্কারের সহিত অনুষ্ঠিত হইলে ইহার ফল ভয়ঙ্কর হয়। মানে হর্ষপ্রকাশ ও অপমানে সন্তাপ করিও না। সাধু ব্যক্তিরা সাধুদিগকে সর্ব্বদা সৎকার করিয়া থাকেন। অসাধুরা কদাচ সাধুবুদ্ধি লাভ করিতে পারে না। ‘এত দান করিলাম’, ‘এতব্রতানুষ্ঠান করিলাম, এইরূপ অহঙ্কার অতি ভয়ঙ্কর, অতএব ইহা যত্নপূর্ব্বক পরিত্যাগ করা কর্ত্তব্য। যে-সকল মনীষী সকলের আশ্রয়ভূত, তাঁহাদিগের সহিত সঙ্গত হইলে ইহলোকে কীর্ত্তি ও পরলোকে সদ্‌গতিলাভ হয়।”-(মহাভারত,কালী প্রসন্ন সিংহ অনুদিত)

শ্রীমহাভারতে ভগবান শিবের 'নীলকন্ঠ' নাম মাহাত্ম্যঃ-

 


মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ ব্যাস প্রণীত শ্রীমহাভারতের আদিপর্ব্বের অষ্টাদশ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

'সুরাসুর তথাপি ক্ষান্ত না হইয়া অনবরতই সমুদ্রমন্থন করিতে লাগিলেন। তাহাতে কালকুট গরল উৎপন্ন হইল। সধূম জ্বলদগ্নির ন্যায় সেই ভয়ঙ্কর গরল ধরণীতল আকুল করিল। কালকূটের কটুগন্ধ আঘ্রাণ করিয়া ত্রিলোকী মূর্চ্ছিত হইল। ব্রহ্মা তদবলোকনে ভীত হইয়া অনুরোধ করাতে সাক্ষাৎ মন্ত্রমূর্ত্তি ভগবান্ ভবানীপতি তৎক্ষণাৎ ঐ বিষম বিষরাশি পান করিয়া কণ্ঠে ধারণপূর্ব্বক ত্রৈলোক্য রক্ষা করিলেন। তদবধি তিনি নীলকণ্ঠ নামে খ্যাত হইয়াছেন।'

-(মহাভারত,কালীপ্রসন্ন সিংহ অনুদিত)

কিরূপ কর্ম্ম করা উচিত?

 


মানব ধৰ্ম্মশাস্ত্রের ভৃগুপ্রোক্তায়াং সংহিতার চতুর্থ অধ্যায়ে এ বর্ণিত আছে-

যৎ কর্ম কুর্বতোঽস্য স্যাৎ পরিতোষোঽন্তরাত্মনঃ।

তৎ প্রযত্নেন কুর্বীত বিপরীত তু বর্জয়েৎ ।।-(মনুস্মৃতি-৪।১৬১)

অর্থাৎ যে কাজ করলে অন্তরাত্মার পরিতোষ উৎপন্ন হয়, তাই যত্নপূর্ব্বক করবে এবং তার বিপরীত কাজ অর্থাৎ যা করলে আত্মার পরিতোষ জন্মেনা পরন্তু গ্লানি উপস্থিত হয় তা সর্বতোভাবে ত্যাগ করা উচিত।

মেধাতিথি ভাষ্যে বলিতেছেন- যে  কাজ করলে লোকনিন্দা না হয় তা করা উচিত। আর যাতে হৃদয় পরিতৃপ্ত হয় না, তা বর্জন করা কর্তব্য।

ধর্ম্মের মূল

 

"সমস্ত বেদ ধর্ম্মের মূল, বেদবেত্তা মন্বাদির স্মৃতি, তাঁহাদিগের ব্রহ্মণ্যতা প্রভৃতি ত্রয়োদশ প্রকার শীল, সাধুদিগের সদাচার এবং আত্মতুষ্টি এই সমুদয় ধৰ্ম্মের প্রমাণস্বরূপ।" -(মনুস্মৃতি-২/৬)

শ্রীকুল্লূক ভট্টের মন্বর্থ মুক্তাবলী টীকাতে ত্রয়োদশ প্রকার শীল বলতে বর্ণিত আছে-"বেদাধ্যয়ন, দেবতা এবং পিতৃপুরুষদের প্রতি ভক্তি, সৌম্যভাব (উগ্রতার অভাব), পরের অপকার না করা, অসূয়া না করা, মৃদুস্বভাব, পারুষ্যের (রুক্ষতার) অভাব, মৈত্রীভাব, প্রিয়বাদিতা, কৃতজ্ঞতা, আশ্রিতকে অভয় দান, করুণতা, প্রশান্তি।"

স্মৃতিতে বিপ্রদের ধর্ম্মের লক্ষণ অর্থাৎ স্বরূপ ও সর্বমনুষ্যের সাধারণ ধর্ম কথনঃ-

 


মানব ধৰ্ম্মশাস্ত্রে ভৃগুপ্রোক্তায়াং সংহিতায়াং ষষ্ঠোহধ্যায়ঃ এ বর্ণিত আছে-

ধৃতিঃ ক্ষমা দমোঽস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ |

ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষণম্ ||

দশ লক্ষণানি ধর্মস্য যে বিপ্রাঃ সমধীয়তে।

অধীত্য চানুবর্তন্তে তে যান্তি পরমা গতিম্ || -(মনুস্মৃতি,৬।৯২,৯৩)

মেধাতিথি ভাষ্য ও কুল্লূকভট্টের মন্বর্থমুক্তাবলী টীকানুারে বঙ্গানুবাদঃ-'ধৃতি অর্থাৎ সন্তোষ, ক্ষমা, দম অর্থাৎ ঔদ্ধত্য না থাকা তথা বিদ্যাপ্রভৃতি জনিত যে উদ্ধতভাব তা ত্যাগ করা, অস্তেয় অর্থাৎ অন্যায়পূর্বক পরধন হরণ না করা, শৌচ অর্থাৎ বাহ্য ও অভ্যন্তর শুচিতা রক্ষা করা তথা আহার প্রভৃতি বিষয়ে শুদ্ধি, ইন্দ্রিয় নিগ্রহ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়সমূহের স্ব স্ব বিষয় হইতে ইন্দ্রিয়গুলোকে প্রত্যাবৃত্ত করানো, ধী অর্থাৎ প্রতিপক্ষের সংশয়াদি নিরাকরণপূর্বক সম্যক্ জ্ঞান প্রাপ্তি, বিদ্যা অর্থাৎ আত্মজ্ঞান (ধী ও বিদ্যা-এ দুটির মধ্যে প্রভেদ এই যে-প্রথমটি কর্ম্মজ্ঞান ও দ্বিতীয়টি অধ্যাত্মজ্ঞান), সত্য এবং অক্রোধ'- এই দশটি ধর্ম্মের লক্ষণ অর্থাৎ স্বরূপ। যে সব বিপ্রব্রাক্ষণ ধর্মের এই দশটি লক্ষণ অধ্যয়ন করেন এবং আত্মজ্ঞান সহকারে ইহার অনুষ্ঠান করেন, তাঁহারা  ব্রহ্মজ্ঞানের উৎকর্ষজন্য মোক্ষরূপ পরমগতি লাভ করেন।

মানব ধৰ্ম্মশাস্ত্রে ভৃগুপ্রোক্তায়াং সংহিতায়াং দশমোহধ্যায়ঃ এ বর্ণিত আছে-

অহিসাং সত্যমস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ |

এতং সামাসিকং ধর্মং চাতুর্বর্ণ্যেঽব্রবীন্ মনুঃ ||-(মনুস্মৃতি-১০।৬৩)

মেধাতিথি ভাষ্য ও কুল্লূকভট্টের মন্বর্থমুক্তাবলী টীকানুারে বঙ্গানুবাদঃ- অহিংসা অর্থাৎ জীবিকার জন্য যেসব প্রাণী বধ্য বলিয়া নির্দিষ্ট আছে তদ্ ব্যতীত অন্যপ্রাণীর প্রতি হিংসা ত্যাগ, পরধনহরণ ইত্যাদি ত্যাগপূর্বক সত্য কথা বলা, মৃত্তিকা জল প্রভৃতি দ্বারা শরীরশুদ্ধি এবং ইন্দ্রিয়সংযম- এই চারটি ধর্ম বর্ণজাতি নির্বিশেষে সর্বমনুষ্যের পক্ষে সাধারণ ধর্ম অর্থাৎ সর্বসাধারণের অনুষ্ঠেয় বলে জানতে হবে।

স্মৃতিশাস্ত্রে মাতৃস্থান অতি উচ্চঃ-

 


মনুসংহিতাতে নারী শুধু পূজ্যা বা সম্মাণীয়া পদেই ভূষিত নহে, এই শাস্ত্রে মাতা পিতার থেকেও সহস্রগুণে মাননীয়া। মানব ধৰ্ম্মশাস্ত্রে ভৃগুপ্রোক্তায়াং সংহিতায়াং দ্বিতিয়োহধ্যায়ঃ এ বর্ণিত আছে-

উপাধ্যায়ান্ দশাচার্য আচার্যাণাং শতং পিতা |

সহস্রং তু পিতৄন্ মাতা গৌরবেণাতিরিচ্যতে ||| -(মনুস্মৃতি,২।১৪৫)

মেধাতিথি ভাষ্য ও কুল্লূকভট্টের মন্বর্থমুক্তাবলী টীকানুারে বঙ্গানুবাদঃ- দশজন উপাধ্যায় থেকে একজন আচার্য্যের গৌরব বেশি, উপনয়নপূর্বক গায়ত্রীমন্ত্রের উপদেষ্টা একশতজন আচার্য্যের থেকে গর্ভদানাদি সংস্কার- সম্পাদনকারী পিতার গৌরব বেশি এবং মাতা পিতার থেকেও সহস্রগুণে মাননীয়া হন।

ভাগবতে অদ্বৈতবেদান্তোক্ত দৃগ্-দৃশ্যবিবেক ও প্রতিবিম্ববাদ—

  সনৎকুমার মোক্ষের সাধন উপদেশ করতে গিয়ে বলছেন — দগ্ধাশয়ো মুক্তসমস্ততদ্গুণো নৈবাত্মনো বহিরন্তর্বিচষ্টে । পরাত্মনোর্যদ্ব্যবধানং...