Monday, 15 July 2024

শ্রীরামকৃষ্ণের দৃষ্টিতে কালীতত্ত্ব—

 


আজ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শুভ আবির্ভাব তিথি। এই পবিত্র লগ্নে কথামৃত থেকে এই পরম কালীসাধকের শ্রীমুখ নিঃসৃত সেই পরমতত্ত্ব তুলে ধরব।

ব্রহ্ম যদি মা, তাহলে তিনি সাকার না নিরাকার?

শ্রীরামকৃষ্ণযিনি ব্রহ্ম, তিনি কালী (মা আদ্যাশক্তি) যখন নিষ্ক্রিয়, তাঁকে ব্রহ্ম বলে কই। যখন সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়এই সব কাজ করেন, তাঁকে শক্তি বলে কই। স্থির জল ব্রহ্মের উপমা। জল হেলচে দুলচে, শক্তি বা কালীর উপমা। কালী! কিনাযিনি মহাকালের (ব্রহ্মের) সহিত রমণ করেন। কালীসাকার আকার নিরাকারা।”......

যিনি ব্রহ্ম, তিনিই শক্তি, তিনিই মা।প্রসাদ বলে মাতৃভাবে আমি তত্ত্ব করি যাঁরে।

সেটা চাতরে কি ভাঙবো হাঁড়ি, বোঝনা রে মন ঠারে ঠোরে " “আমি তত্ত্ব করি যাঁরে" অর্থাৎ আমি সেই ব্রহ্মের তত্ত্ব করছি। তাঁরেই মা মা বলে ডাকছি। আবার রামপ্রসাদ ওই কথাই বলছে,—"আমি কালীব্রহ্ম জেনে মর্ম, ধর্মাধর্ম সব ছেড়েছি।"

ধর্মাধর্ম ত্যাগ করলে কি বাকি থাকে?

শ্রীরামকৃষ্ণশুদ্ধাভক্তি। আমি মাকে বলেছিলাম, মা! এই লও তোমার ধর্ম, এই লও তোমার অধর্ম, আমায় শুদ্ধাভক্তি দাও; এই লও তোমার পাপ, আমায় শুদ্ধাভক্তি দাও; এই লও তোমার জ্ঞান, এই লও তোমার অজ্ঞান, আমায় শুদ্ধাভক্তি দাও! দেখ, জ্ঞান পর্যন্ত আমি চাই নাই। আমি লোকমান্যও চাই নাই। ধর্মাধর্ম ছাড়লে শুদ্ধাভক্তিঅমলা, নিষ্কাম, অহেতুকী ভক্তিবাকি থাকে।

এই আদ্যাশক্তি দর্শন আর ওই ব্রহ্মজ্ঞান, কি উপায়ে হতে পারে?

শ্রীরামকৃষ্ণব্যাকুল হৃদয়ে তাঁকে প্রার্থনা করো। আর কাঁদো! এইরূপে চিত্তশুদ্ধি হয়ে যাবে। নির্মল জলে সূর্যের প্রতিবিম্ব দেখতে পাবে। ভক্তের আমিরূপ আরশিতে সেই সগুণ ব্রহ্ম আদ্যাশক্তি দর্শন করবে। কিন্তু আরশি খুব পোঁছা চাই। ময়লা থাকলে ঠিক প্রতিবিম্ব পড়বে না।

যতক্ষণআমিজলে সূর্যকে দেখতে হয়, সূর্যকে দেখবার আর কোনরূপ উপায় হয় না। আর যতক্ষণ প্রতিবিম্ব সূর্যকে দেখবার উপায় নাই, ততক্ষণ প্রতিবিম্ব সূর্যই ষোল আনা সত্যযতক্ষণ আমি সত্য ততক্ষণ প্রতিবিম্ব সূর্যও সত্যষোল আনা সত্য। সেই প্রতিবিম্ব সূর্যই আদ্যাশক্তি। ব্রহ্মজ্ঞান যদি চাওসেই প্রতিবিম্বকে ধরে সত্য সূর্যের দিকে যাও। সেই সগুণ ব্রহ্ম, যিনি প্রার্থনা শুনেন তাঁরেই বলো, তিনিই সেই ব্রহ্মজ্ঞান দিবেন। কেননা, ইনিই সগুণ ব্রহ্ম, তিনিই নির্গুণ ব্রহ্ম, যিনিই শক্তি, তিনিই ব্রহ্ম। পূর্ণজ্ঞানের পর অভেদ।

তথ্যসূত্রঃ- শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত।

শ্রীশুভ চৌধুরী

মার্চ ১২, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

শিক্ষাষ্টকঃ-

 


আজ পরম কৃষ্ণভক্ত শ্রীচৈতন্য ভারতীর আবির্ভাব তিথি। প্রেমের অবতার মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের দিব্যোন্মাদ-দশায় তাঁরই শ্রীমুখপদ্ম-বিনিঃসৃত এই "শিক্ষাষ্টক"

চেতোদর্পণমার্জনং ভবমহাদাবাগ্নি-নির্বাপণং

শ্রেয়ঃকৈরবচন্দ্রিকা বিতরণং বিদ্যাবধূজীবনম্।

আনন্দাম্বুধিবর্দ্ধনং প্রতিপদং পূর্ণামৃতাস্বাদনং

সর্বাত্মস্নপনং পরং বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণসংকীর্তনম্।।১

ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নাম চিত্তরূপ দর্পণকে মার্জন করে, জন্ম-মৃত্যুরূপ সংসার-দাবানলকে নির্বাপণ করে। সন্ধ্যায় যেমন চন্দ্রের শীতলজ্যোৎস্নায় কুমুদপুষ্প বিকশিত হয়, সেরূপ শ্রীকৃষ্ণনামরূপ অমৃতধারায় হৃদয়-উল্লসিত হয় এবং শেষে আত্মার অন্তর্নিহিত ভাব-সম্পদ কৃষ্ণপ্রেম জাগ্রত হয়। সেই প্রেমামৃত পুনঃ পুনঃ আস্বাদন করে আত্মা প্রেমপারাবারে পরিপূর্ণ নিমজ্জিত হয়। আত্মার যাবতীয় বিভাব পরিপূর্ণ সন্তোষ লাভ করে এবং পবিত্র হয় এবং সর্বশেষে শ্রীকৃষ্ণনামের প্রভাব বিজয় লাভ করে।

নাম্নামকারি বহুধা নিজসর্বশক্তি-

স্তত্রার্পিতা নিয়মিতঃ স্মরণে কালঃ।

এতাদৃশী তব কৃপা ভগবন্মমাপি

দুর্দৈবমীদৃশমিহাজনি নানুরাগঃ।।২

হে ভগবান্! তোমার পবিত্র নাম সকলের উপর কল্যাণ বর্ষণ করে। আর তোমার কৃষ্ণ, গোবিন্দ প্রভৃতি অসংখ্য নাম আছে যার মাধ্যমে তুমি নিজেকে প্রকাশ করে থাক। তুমি দয়া করে নিজের সর্বশক্তি নামের মধ্যেই নিহিত করেছ। আর নামকীর্তনে স্থান কালের কোন নিয়ম রাখেন নি। তুমি অহৈতুকী কৃপা করে নামরূপে অবতীর্ণ হয়েছ। কিন্তু আমার এমনই দুর্দৈব, সেই নামে আমার কোন অনুরাগ হল না।

তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা।

অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ।।৩

যে সাধক তৃণ হতেও সুনীচ, বৃক্ষের চেয়েও সহিষ্ণু, যে অপরকে যথাযথ সম্মান দেয়, কিন্তু নিজে কারও কাছ থেকে সম্মান চায় না, সেই- হরিনাম-কীর্তনের যথার্থ অধিকারী।

ধনং জনং সুন্দরীং

কবিতাং বা জগদীশঃ কাময়ে।

মম জন্মনি জন্মনীশ্বরে

ভবতাদ্ভক্তিরহৈতুকী ত্বয়ি।।৪

হে জগদীশ! আমি ধন চাই না, অনুগামী লোকজন চাই না, সুন্দরী নারী, কাব্য কবিতা এসব কিছুই চাই না। জন্মে জন্মে যেন তোমার ভক্তি করতে পারি।

অয়ি নন্দতনুজ কিঙ্করং

পতিতং মাং বিষমে ভবাম্বুধৌ।

কৃপয়া তব পাদপঙ্কজ-

স্থিতধূলীসদৃশং বিচিন্তয়।।৫

হে নন্দতনুজ! আমি তোমার নিত্য দাস। তথাপি আমি নিজ কর্মদোষে এই জন্ম-মৃত্যুর সংসার-সাগরে নিমজ্জিত হয়েছি। এই পতিতাধমকে তুমি দাস বলে গ্রহণ কর এবং তোমার শ্রীচরণের একটি ধূলিকণারূপে মনে কর।

নয়নং গলদশ্রুধারয়া

বদনং গদ্গদ্রুদ্ধয়া গিরা।

পুলকৈর্নিচিতং বপুঃ কদা

তব নামগ্রহণে ভবিষ্যতি।।৬

হে নাথ! এমন দিন কবে হবেযখন তোমার নামকীর্তন করতে করতে শ্রাবণের বারিধারার মত আমার চোখের জল নেমে আসবে। গলার স্বর প্রেমানন্দে কাঁপবে, শরীরে রোমাঞ্চ হবে।

যুগায়িতং নিমেষেণ চক্ষুষা প্রাবৃষায়িতম্।

শূন্যায়িতং জগৎ সর্বং গোবিন্দবিরহেণ মে।।৭

হে গোবিন্দ! তোমার বিচ্ছেদে সমস্ত জগৎ শূন্য দেখছি। বর্ষার বারিধারার মত আমি চোখের জলে ভাসছি। তোমার বিরহে এক নিমেষও যুগের মত মনে হয়।

আশ্লিষ্য বা পাদরতাং পিনষ্টু মাম্

অদর্শনান্মর্মহতাং করোতু বা।

যথা তথা বা বিদধাতু লম্পটো

মৎপ্রাণনাথস্তু এব নাপরঃ।।

শ্রীকৃষ্ণ আমায় ভালবেসে আলিঙ্গনই করুক, কিংবা তাঁর পদতলে পিষেই ফেলুক, আমাকে দেখা না দিয়ে আমার হৃদয়কে পুড়িয়ে ছারখারই করুক, সে লম্পট যা ইচ্ছা তাঁর তাই করুক, তথাপি তিনিই আমার প্রাণনাথ, আর কেউ নয়।.…….

শ্রীশুভ চৌধুরী

দোল পূর্ণিমা, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

অক্ষয় তৃতীয়া

 


বৈশাখ মাসের শুক্লাতৃতীয়াকে অক্ষয় তৃতীয়া বলে। এই দিনে স্নান, দান, তপ, শ্রাদ্ধ এবং হোম ইত্যাদি অনুষ্ঠান করলে তা সকলই অক্ষয় ফল দান করে।

বৈশাখমাসস্য তু যা তৃতীয়া নবম্যসৌ কার্তিকশুক্লপক্ষে।

নভস্যমাসস্য তমিস্রপক্ষে ত্রয়োদশী পঞ্চদশী মাঘে ৷৷

এতা যুগাদ্যাঃ কথিতাঃ পুরাণৈ- রনন্তপুণ্যাস্তিথয়শ্চতস্রঃ।

-(বিষ্ণুপুরাণ তৃতীয়াংশ, অধ্যায় ১৪, ১২-১৩)

বৈশাখমাসের শুক্লা তৃতীয়া, কার্তিকের শুক্লা নবমী, ভাদ্রমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী এবং মাঘ মাসের অমাবস্যা চার তিথিকে পুরাণেযুগাদ্যানামে অভিহিত করা হয়। এই চারতিথি অনন্ত পুণ্যদায়িনী। এই চার দিবসে শ্রাদ্ধাদি করলে, অনন্ত ফললাভ হয়।

অথান্যামপি বক্ষ্যামি তৃতীয়াং সর্বকামদাম্।

যস্যাংদত্তং হুতং জপ্তং সর্বং ভবিত চাক্ষয়ম্।।

বৈশাখশুক্লপক্ষে তু তৃতীয়া যৈরুপোষিতা।

অক্ষয়ফলমাপ্নোতি সর্বস্য সুকৃতস্য চ।।

সা তথা কৃত্তিকোপেতা বিশেষনে সুপূজিতা।

তত্র দত্তং হুতং জপ্তং সর্বক্ষয়মুচ্যতে।।

-(মৎস্যপুরাণ, ৬৫, -)

অনন্তর অপর এক সর্বকামদায়িনী তৃতীয়া তিথির বিষয় বলছি। এই তিথিতে দান, হোম, জপ ইত্যাদি যা কিছু করা যায়, সে সকলই অক্ষয় হয়ে যায়। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষীয় তৃতীয়া তিথিতে যে সকল ব্যক্তি উপবাস করে, তারা নিখিল সুকৃতি সঞ্চয়ের অক্ষয় ফল লাভ করে। এই তৃতীয়া তিথি কৃত্তিকানক্ষত্রে অন্বিতা হলে সবিশেষ প্রশস্ত হয়। তাতে দান, হোম বা জপ যে কিছু করা যায়, তা সকলই অক্ষয় ফলজনক বলে শাস্ত্রে কীৰ্ত্তিত।.....

শ্রীশুভ চৌধুরী

অক্ষয় তৃতীয়া, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ।

পুরীধাম শ্রীক্ষেত্র মাহাত্ম্য ও ত্রিমূর্তির আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা—

 


শ্রীগুরু কৈবল্যনাথ শ্রীশ্রীরামঠাকুর বলিতেছেনবিশাল জলধিতীরে "অপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা, পশ্যত্যচক্ষুঃ শৃণোত্যকর্ণঃ"—(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-/১৯) শ্রীশ্রীপুরুষোত্তম জগন্নাথ বিরাজিত। তিনি হস্ত পদশূন্য হইয়াও বেগবান বা সচল গ্রহীতা, চক্ষুহীন হইয়াও দর্শন করেন, কর্ণহীন হইয়াও শ্রবণ করেন। উৎকলে তিনি দারুব্রহ্ম নামেই খ্যাত। তাঁকেই আবার আদর করিয়া ডাকা হয় "নীলাচলের নীলমাধব।"

জানেন তো শ্রীশ্রীজগন্নাথ প্রভুর মন্দিরে প্রতিদিন ভোগ হয় ছাপ্পান্নটা এবং ছত্রিশ প্রকার ব্যঞ্জন দ্বারা পরিবেশন করা হয়। প্রতি ভোগে তুলসী পত্র দিয়া অর্পণ না করিলে প্রভু তাহা গ্রহণ করেন না। তাই বৈষ্ণব মহাজন বাক্যে এইরূপ উক্ত হইয়াছে

ছাপ্পান্ন ভোগ ছত্রিশ ব্যঞ্জন

বিনা তুলসী হরি এক না মানই।

শ্রীক্ষেত্রে রথযাত্রা উৎসবই প্রধান। সহস্র সহস্র নরনারী পুরুষোত্তম জগন্নাথদেবকে দর্শন করার জন্য প্রতিবৎসরই ছুটিয়া যায়। এই ছুটিয়া যাওয়ার পিছনে আছে পুনর্জন্ম রহিত হওয়ার বাণী—"রথে তু বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম বিদ্যতে।" এই যে পরম মহিমাময় বিশ্ব বিশ্রুত দেবতা শ্রীশ্রীজগন্নাথদেব তাহার সম্বন্ধে বাহির হইতে আমরা যা দেখিতেছি তাহার পিছনে কি অন্তর্নিহিত জিনিস রহিয়াছে খুঁজিয়া দেখা দরকার। মূর্তি তো ভাবেরই প্রকাশ স্থূলেতে। কেহ যদি জিজ্ঞাসা করেন যে এই জগন্নাথদেবের আকার কিরূপ তাহার কিন্তু কোন প্রীতিপ্রদ উত্তর দিতে পারা যায় না। কারণ বর্ণনাযোগ্য হস্তপদাদি কোন আকারই যেন তাঁহার নাই, অথচ আকারবানও বটে। এমন অসামঞ্জস্যরূপ তো কোন মূর্তিতে দেখা যায় না। ব্রহ্ম সাকার অথচ নিরাকার, সগুণ অথচ নির্গুণ অর্থাৎ পরস্পর বিরুদ্ধ বিভাগের সমন্বয়। ব্রহ্মের স্বরূপ বর্ণনা করিতে গিয়া ভগবান্ গীতাতে এভাবে আভাস দিয়াছেন

সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্৷

অসক্তং সর্বভৃচ্চৈব নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ৷৷

-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৩/১৫)

তিনি চক্ষুরাদি সমুদয় ইন্দ্রিয় বৃত্তিতে প্রকাশমান অথচ সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিত, নিঃসঙ্গ অর্থাৎ সর্বসঙ্গশূন্য অথচ সকলের আধারস্বরূপ, নির্গুণ অথচ সত্ত্বাদি-গুণের ভোক্তা। তাঁহার স্বরূপই এই, তাই জগন্নাথদেবে ইহা যুগপৎ বর্তমান। শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের মধ্যে সাকার অথচ নিরাকার, নিরাকার অথচ সাকারএই মূল তত্ত্বেরই আভাস পাই।

ত্রিমূর্তিতে সৎ, চিৎ, আনন্দস্বরূপ জগন্নাথ, সুভদ্রা বলরাম মূর্তি। বিশাল জলধিতীরে নীলাচল শিখরে অবস্থিত সুরম্য প্রাসাদ মধ্যে জগন্নাথদেব, মধ্যভাগে সুভদ্রা দক্ষিণে সহোদর বলভদ্রের সহিত আসীন। বলভদ্ররূপে তিনি চিৎ প্রকাশ, এইহেতু শ্বেতবর্ণ। বলভদ্রের এক নাম সঙ্কর্ষণ, যেহেতু তিনি জীবকে সম্যক প্রকারে আকর্ষণ করেন। দেবী সুভদ্রা আনন্দের প্রতীক। 'সু' অর্থ উত্তম, ভদ্র অর্থ মঙ্গল। আনন্দই সর্বোৎকৃষ্ট মঙ্গল, তাই সুভদ্রা নামে আখ্যাতা। জগন্নাথদেবের কান্তি জলপূর্ণ মেঘের ন্যায় শ্যামল। যেহেতু তাঁহার সবিশেষ কোন বর্ণ নাই, তাই শ্যামল প্রতিভাত হয় যাহা অনন্তেরই প্রতীক। আকাশের নিজস্ব কোন রং নাই তবু নীলবর্ণ। জীব হৃদয়ে তাঁহাকে জানিবার আকাঙ্ক্ষা যখন প্রবল হয়, তখন তিনি তাহাদের অন্তরে বৈরাগ্য উৎপাদন করিয়া বিশাল মায়া জলধি অতিক্রম করাইয়া বিশ্বাতীত স্বরূপ দান করেন। তখন ভক্ত ভগবান এক রস। কে কার পূজা অর্চনা করিবে, তাই শুধু দর্শন আর ভোগ।

তৎপর শ্রীশ্রীঠাকুর বৈষ্ণব মহাজন পদটির এইরূপ বিশ্লেষণ দিলেন

ভোগ ৫৬ টা যথাঃ-

পঞ্চভূতক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ব্যোম।

পঞ্চতন্মাত্রগন্ধ, রস, রূপ, স্পর্শ, শব্দ।

দশ ইন্দ্রিয়পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, বাক্, পাণি, পাদ, পায়ু, উপস্থ।

পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক্।

ছয় ঐশ্বর্য্যঐশ্বর্য্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান, বৈরাগ্য।

ছয় প্রপঞ্চপ্রপঞ্চ, ভুবন, মূর্তি, মন্ত্র, দেবতা, মাতর।

ছয় রিপুকাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য্য।

ছয় ভোগক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা, আলস্য, ভয়, শোক।

ছয় দণ্ডজন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি, দুঃখ, দণ্ড।

ছয় অহঙ্কারঅহঙ্কার, অভিমান, দম্ভ, দর্প, পারুষ্য, গর্ব।

ছাপ্পান্ন ভোগ ত্যাগ হইলেই এক হয়। ভোগমুক্ত হইলেই মুক্তি। তৌল দ্বারা দুইপক্ষ সমান হইলেই ভোগমুক্তি হয়। শ্রীভগবান গীতায় দ্বিতীয় অধ্যায়ে সমাধিস্থ স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ বর্ণনা করিয়া সম্যক অবস্থাকে "ব্রাহ্মীস্থিতি" আখ্যা দিয়াছেন। সমাধি অর্থ চিত্তের সমাধানের স্থিতি। সমাধান অর্থ সমতুলন। দাঁড়ির দু পাল্লা ঠিক সমান হইলে বলা হয় দাঁড়ি সমতুল হইয়াছে। চিত্তের স্থিতি তুলাদন্ডের মতো সমতুল, অচল, শান্ত। পরে ষষ্ঠ অধ্যায়ে স্থিতির তুলনা করা হইয়াছে বায়ু শূন্য স্থানের কম্পহীন দীপশিখার সঙ্গে। অন্তঃকরণে কোন বিষয়কার বৃত্তি অর্থাৎ চিন্তার উদয় না হইলেই উহা নিশ্চল থাকে এবং সদাই নিশ্চলভাবে আত্মাতে অবস্থিতি করে।

৩৬ ব্যঞ্জনচতুর্বেদ, চতুর্দ্দশ শাস্ত্র, অষ্টাদশ মর্ম (নামের মধ্যে সবই আছে)

তুলসীএটা বেশী, ওটা কম, এই দুইটা সমান হইলে মুক্তি। জন্যই তুলসীপত্র না হইলে নারায়ণ ভোগ গ্রহণ করেন না। ভোগ থাকিলেই যোগ কমিয়ে যায়, ভোগ ত্যাগ হইয়া গেলেই শান্তি। তাই গীতায় স্থিতপ্রজ্ঞ, গুণাতীত ভক্তের অবস্থা। সকলের একই লক্ষণ। অবস্থায়ই অহং বুদ্ধির লোপ হয়। এই যে ভাব তাহা অনির্বচনীয়।

ঠাকুর ভক্ত সমাবেশে কয়েক ঘন্টাব্যাপী অক্লান্তসুরে উপদেশামৃত বর্ষণ করিতেন। সুদীর্ঘ সেই উপদেশ থেকে সুনির্বাচিত রত্নসাদৃশ্য বহু উদ্ধৃতিই ভক্তদের গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে দেওয়া যাইতে পারে। কিন্তু দীর্ঘকালীন উপদেশ হুবহু লেখা কাহারও পক্ষেই সম্ভব নহে। একথা তো ঠাকুরই বলিয়াছেন— ''প্রজাপতি বলিয়াছেন আর ব্যাসদেব লিখিয়াছেন, আর কেহই লিখিতে পারে নাই"

তথ্যসূত্রঃ-

. পুরীধাম শ্রীক্ষেত্রঃ "শ্রীশ্রীরামঠাকুর কথামৃত", বিন্দু, পৃষ্ঠা ৩৫, শ্রীব্রজেন্দ্র কুমার চৌধুরী।

. সত্যধাম থেকে প্রকাশিত "ক্রন্দসী" শীর্ষক গ্রন্থ, শ্রীমতী প্রমীলা দত্ত।

শ্রীশুভ চৌধুরী

জুন ২২, শনিবার, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা।

ভাগবতে অদ্বৈতবেদান্তোক্ত দৃগ্-দৃশ্যবিবেক ও প্রতিবিম্ববাদ—

  সনৎকুমার মোক্ষের সাধন উপদেশ করতে গিয়ে বলছেন — দগ্ধাশয়ো মুক্তসমস্ততদ্গুণো নৈবাত্মনো বহিরন্তর্বিচষ্টে । পরাত্মনোর্যদ্ব্যবধানং...