Sunday, 28 April 2024

তন্ত্রে কালীতত্ত্ব ও কালী মূর্তি রহস্য —

 


কালী নামের তাৎপর্য কি? অর্থাৎ মাকে কেন কালী নামে ডাকা হয়? শুরুতেই এই প্রসঙ্গে আলোচনা করি। মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে

তব রূপং মহাকালো জগৎসংহারকারকঃ।

মহাসংহারসময়ে কালঃ সর্বং গ্রসিষ্যতি।।

কলনাৎ সর্বভূতানাং মহাকালঃ প্রকীর্তিতঃ।

মহাকালস্য কলনাৎ ত্বমাদ্যা কালিকা পরা।।

কালসংগ্রহণাৎ কালী সর্বেষামাদিরূপিণী।

কালত্বাদাদিভূতত্বাদাদ্যা কালীতি গীয়সে।। –(মহানির্বাণতন্ত্র- /৩০-৩২)

জগৎ-সংহারকারক মহাকাল তোমার একটি রূপমাত্র, সেই মহাকাল মহাপ্রলয়ে সমুদয় পদার্থকে গ্রাস করবেন। সর্বভূতকে গ্রাস করেন বলেই তাঁর নাম মহাকাল; তুমি এই মহাকালকে গ্রাস কর বলেই পরাৎপরাকালিকানামে প্রসিদ্ধ। কালকে গ্রাস কর বলেই তোমার নাম কালী, সকলের আদিকালত্ব আদিভূতত্ব নিবন্ধন লোকে তোমাকে আদ্যাকালী বলে কীর্তন করে।

তিনি পরমাত্মা পরব্রহ্মের সাক্ষাৎ পরমা প্রকৃতি। "ত্বং পরা প্রকৃতিঃ সাক্ষাৎ ব্রহ্মণঃ পরমাত্মনঃ" তিনি প্রলয়সময়ে বাক্যের অতীত, মনের অগোচর, নিরাকারস্বরূপ তমোময় রূপ অবলম্বন করে একমাত্র বিদ্যমান থাকেন। তিনি সাকার হয়েও নিরাকারা; কিন্তু মায়ার আশ্রয় গ্রহণ করে নানাবিধরূপ ধারণ করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে মহাদ্যুতি কালিকার রূপ নেই, সত্ত্বাদিগুণত্রয়েয় প্রাদুর্ভাব বশতঃ সৃষ্ট্যাদিকার্য্যানুসারে ইদানীং তাঁর রূপকল্পনা করা যাচ্ছে। উপাসকদের কার্যসিদ্ধির নিমিত্ত গুণ ক্রিয়ানুসারে দেবীর রূপকল্পনা হয়ে থাকে।

মহানির্ব্বাণ তন্ত্রে মাতৃকা ধ্যানে উল্লেখ করা বর্ণনা অনুসারে -

মেঘাঙ্গীং শশিশেখরাং ত্রিনয়নাং রক্তাম্বয়ং বিভ্রতীং,

পাণিভ্যামভয়ং বরঞ্চ বিলসদ্রক্তারবিন্দস্থিতাম।

নৃত্যন্তং পুরতো নিপীয় মধুরং মাধ্বীকমদ্যং মহাকালং

বীক্ষ্য বিকাসিতাননবরামাদ্যাং ভজে কালিকাম।। -(মহানির্বাণতন্ত্র- /১৪১)

যাঁর বর্ণ মেঘতুল্য, ললাটে চন্দ্রলেখা জাজ্বল্যমান, যাঁর তিন চক্ষু, পরিধান রক্তবস্ত্র, দুই হস্তে বর অভয়, যিনি ফুল্লারবিন্দে উপবিষ্ট, যাঁর সম্মুখে মাধ্বীকপুষ্পজাত সুমধুর মদ্য পান করে মহাকাল নৃত্য করছেন, যিনি মহাকালের এরূপ অবস্থা দর্শনে হাস্য করছেন, সেই আদ্যা কালিকাকে ভজন করি।

কালো বা কৃষ্ণবর্ণ হওয়ার কারণেও মাকে কালী নামে ডাকা হয়। মা কালী কেনো কালো? এই কৃষ্ণ বর্ণ হওয়ার তাৎপর্য কি? সেই প্রসঙ্গে মহানির্ব্বাণ তন্ত্রে সদাশিব বলছেন

শ্বেতপীতাদিকো বর্ণো যথা কৃষ্ণে বিলীয়তে।

প্রবিশন্তি তথা কাল্যাং সর্ব্বভূতানি শৈলজে।।

অতস্তস্যাঃ কালশক্তের্নির্গুণায়া নিরাকৃতেঃ।

হিতায়াঃ প্রাপ্তযোগানাং বর্ণঃ কৃষ্ণো নিরূপিতঃ।।

-(মহানির্বাণতন্ত্র- ১৩/-)

হে শৈলজে! শ্বেত, পীত, প্রভৃতি বর্ণ সকল যেরূপ একমাত্র কৃষ্ণবর্ণে বিলীন হয়, তার ন্যায় সমুদয় পদার্থই আদ্যাকালীতে বিলীন হয়ে থাকে। এই জন্য যাঁরা যোগী, তাঁরা সেই নির্গুণা, নিরাকারা, বিশ্বহিতৈষিণী কালশক্তির কৃষ্ণবর্ণ কল্পনা করেছেন।

মায়ের কপালে অর্ধচন্দ্রাকৃতির শশিচিহ্ন থাকে কেনো?

যদি আমরা মায়ের মূর্তিটি ভালোভাবে দেখি তবে দেখতে পাবো তৃতীয় নয়নের নিচে একটি অর্ধচন্দ্র আছে। এর তাৎপর্য প্রসঙ্গে মহানির্ব্বাণ তন্ত্রে সদাশিব বলছেন

নিত্যায়াঃ কালরূপায়া অব্যয়ায়াঃ শিবাত্মনঃ।

অমৃতত্বাল্ললাটেঽস্যাঃ শশিচিহ্নং নিরূপিতম।।

-(মহানির্বাণতন্ত্র- ১৩/)

তিনি কালরূপিণী, নিত্যা, অব্যয়া, শিবাত্মিকা কল্যাণময়ী সুতরাং তিনি অমৃতস্বরূপ হেতু তদীয় ললাটে চন্দ্রকলা কল্পিত হয়েছে।

মা কালীর কেনো তিনটি নেত্র?

এই প্রসঙ্গে মহানির্ব্বাণ তন্ত্রে সদাশিব বলছেন

শশিসূর্য্যাগ্নিভির্নেত্রৈরখিলং কালিকং জগৎ।

সম্পশ্যতি যতস্তস্মাৎ কল্পিতং নয়নত্রয়ম।।

-(মহানির্বাণতন্ত্র- ১৩/)

তিনি সতত চন্দ্র, সূর্য্য অগ্নিরূপ ত্রিনেত্র দ্বারা কালসম্ভূত এই জগৎ পর্য্যবেক্ষণ করছেন। এই হেতু যোগিগণ তাঁর ত্রিনয়ন কল্পনা করেছেন।

মহাকালীর রক্ত বস্ত্রের তাৎপর্য কি? এই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে

গ্রসনাৎ সর্ব্বসত্ত্বানাং কালদন্তেন চর্ব্বণাৎ।

তদ্রক্তসঙ্ঘো দেবেশ্যা বাসোরূপেণ ভাষিতম।।

 -(মহানির্বাণতন্ত্র- ১৩/)

তিনি প্রলয়সময়ে সর্ব্বপ্রাণীকে গ্রাস কালদন্তে চর্ব্বণ করেন বলে জীবের রুধিরসঙ্ঘাত সেই মহাকালীর রক্তবস্ত্ররূপে কল্পিত হয়েছে।

মা এক হাতে অভয় আরেক হাতে বর মুদ্রা ধারণ করেন কেন?

সময়ে সময়ে জীবরক্ষণং বিপদঃ শিবে।

প্রেরণং স্বস্বকার্য্যেষু বরশ্চাভয়মীরিতম।।

-(মহানির্বাণতন্ত্র- ১৩/১০)

হে শিবে! তিনি বিপদ হতে যথাযথ সময়ে জীবগণকে রক্ষা স্ব স্ব কার্য্যে প্রেরণ করেন বলে তাঁর হস্তে বর অভয় শোভা পেয়ে থাকে।

মা কেন রক্তপদ্মাসনে স্থিতা?

রজোজনিতবিশ্বানি বিষ্টভ্য পরিতিষ্ঠতি।

অতো হি কথিতং ভদ্রে রক্তপদ্মাসনস্থিতা।।

-(মহানির্বাণতন্ত্র- ১৩/১১)

হে ভদ্রে! তিনি রজোগুণজাত বিশ্বে অধিষ্ঠান করেন বলে তাঁর রক্তপদ্মে অধিষ্ঠান কথিত হয়ে থাকে।

ক্রীড়ন্তং কালিকং কালং পীত্বা মোহময়ীং সুরাম্।

পশ্যন্তী চিন্ময়ী দেবী সর্ব্বসাক্ষিস্বরূপিণী।।

-(মহানির্বাণতন্ত্র- ১৩/১২)

সৃষ্টিকালসম্ভূত মহাকাল মোহময়ী সুরাপান করে ক্রীড়া করছেন, অর্থাৎ কালের প্রভাবে শূন্যস্থানে নুতন জগৎ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, কোথাও জীবসঙ্কুল জগৎ শূন্য হয়ে যাচ্ছে, কোথাও ঘোর তিমিরাবৃত স্থান আলোকিত হচ্ছে, কোথাও আলোকিত স্থান তিমিরাবৃত হয়ে পড়ছে। প্রত্যেক জগৎপ্রতি নক্ষত্র যথাযথ মার্গে প্রধাবিত হচ্ছে, চিন্ময়ী সর্বসাক্ষিস্বরূপিণী দেবী এটা দর্শন করে থাকেন।......

তথ্যসূত্রঃ- মহানির্বাণ-তন্ত্র, উপেন্দ্রনাথ মুখ্যোপাধ্যায় অনূদিত।

শ্রীশুভ চৌধুরী

জানুয়ারি , ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

No comments:

Post a Comment

ভাগবতে অদ্বৈতবেদান্তোক্ত দৃগ্-দৃশ্যবিবেক ও প্রতিবিম্ববাদ—

  সনৎকুমার মোক্ষের সাধন উপদেশ করতে গিয়ে বলছেন — দগ্ধাশয়ো মুক্তসমস্ততদ্গুণো নৈবাত্মনো বহিরন্তর্বিচষ্টে । পরাত্মনোর্যদ্ব্যবধানং...