Thursday, 17 November 2022

ব্রহ্মগীতায় শিবতত্ত্ব কথনঃ-

 


এষ দাতা চ কর্ত্তা চ সংহর্ত্তা চ যুগে যুগে। ২

অর্থাৎ ঈশ্বর মহাদেবই যুগে যুগে দাতা, কর্ত্তা এবং সংহর্ত্তা।

এবং জ্ঞানং পরংব্রহ্ম প্রশান্তং নির্ম্মলং শিবম্।।৪

 অব্যক্তঞ্চৈব ব্যক্তঞ্চ জ্ঞানঞ্চাজ্ঞানমেবচ।

সাংখ্যং যোগং পরং সাংখ্যং যঃ পশ্যতি স পশ্যতি। ৫

অর্থাৎ তিনি জ্ঞানাতীত পরব্রহ্ম, প্রশান্ত, নির্ম্মল, শিব, ব্যক্ত তথাপি অব্যক্ত, জ্ঞান-অজ্ঞানস্বরূপ, সাংখ্য-যোগস্বরূপ; যে ব্যক্তি তত্ত্বজ্ঞানগম্য শিবকে দর্শন করে, সে যথার্থ জানিতে পারে।

-(শিবমহাপুরাণ, সনৎকুমার সংহিতা, ব্রহ্মাকর্তৃক কথিত ব্রহ্মগীতা নামক নবম অধ্যায়)

‘নমঃ শিবায়' পঞ্চাক্ষর মন্ত্রের যথার্থ মাহাত্ম্যঃ-

 


শিব মহাপুরাণের বায়বীয় সংহিতার উত্তরভাগে পঞ্চাক্ষরমন্ত্রতত্ত্বনিরূপণং নাম দ্বাদশ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

বেদে ও শিবাগমে ঐ পঞ্চাক্ষর মন্ত্র ষড়াক্ষরে উক্ত আছে এবং লোকে পঞ্চাক্ষররূপে প্রকাশ পাইয়া থাকে। সর্বজ্ঞ শঙ্কর সকল দেহীর অশেষ অর্থসিদ্ধি নিমিত্ত অল্পাক্ষর সমন্বিত হইলেও অর্থবহুল, মুক্তিপ্রদ, নানা সিদ্ধিভূষিত, লোকচিত্তানুরঞ্জক, বিনিশ্চিতার্থ, সুখোচ্চার্য্য, বেদসার ' নমঃ শিবায়' এই আজ্ঞাসাধক অসন্দিগ্ধ দিব্য মন্ত্র উপদেশ দিয়াছেন।

ঐ সর্বশ্রেষ্ঠ আদিম ষড়াক্ষর মন্ত্র নিখিল বিদ্যার বীজ, বটবীজ-সদৃশ অতিসুক্ষ্ম মহান অর্থের সাধন। ত্রিগুণাতীত সর্বজ্ঞ সর্বস্রষ্টা সর্বব্যাপী ভগবান্ শিব  প্রণবরূপ একাক্ষর মন্ত্রে অধিষ্ঠান করিতেছেন। সূক্ষ্ম ঈশানাদি একাক্ষর পাঁচটি মন্ত্র 'নমঃ শিবায়' এই মন্ত্রে যথাক্রমে অধিষ্ঠান করিতেছেন।

শিবাগমে সেই ভগবান্ আদিমধ্যান্তশূন্য, স্বভাব-বিমল, পরিপূর্ণ, সর্বজ্ঞ ও প্রভুরূপে জ্ঞেয় হন। ঐ মন্ত্র সেই শিবের অভিধান, সুতরাং তিনি সেই মন্ত্রের অভিধেয়, অতএব ঐপ্রকারে অভিধান-অভিধেয় ভাব থাকাতে মন্ত্রও পরমপুরুষ শিব বলিয়া প্রসিদ্ধ। ' নমঃ শিবায়' এতাবন্মাত্রই শিবজ্ঞান, এবং এতাবন্মাত্রই পরমপদ বলিয়া বিদিত হয়, যেহেতু ঐ ষড়ক্ষর মন্ত্রকে শিব স্বয়ং বলিয়াছেন।

....................................................................................

তথ্যসূত্রঃ- শিবপুরাণ, পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত ও শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ কর্তৃক পরিদৃষ্ট।

শুভাবহ স্তবঃ-

 


শিব মহাপুরাণের জ্ঞানসংহিতার ত্রিপুরোপখ্যানে এয়োবিংশোহধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

দেবা উচুঃ।

শঙ্করায় নমস্তেহস্তু নমস্তে পরমাত্মনে।

পরাবরস্বরূপায় নমস্তে শূলপাণয়ে।। ১৯

দেবগণ বলিলেন-'হে শঙ্কর! হে পরমাত্মন্! আপনাকে নমস্কার করি। হে শূলপাণে! আপনি পরাবর (উচ্চনীচ-) স্বরূপ, আপনার উদ্দেশ্যে এই দেবগণের অসংখ্য নমস্কার। ১৯

নমো গণাধিদক্ষায় কপর্দ্দিনে নমোহস্তু তে।

নমোহস্তু তে ত্রিনেত্রায় বেদানাং পতয়ে নমঃ।২০

হে গণাধিপ!  হে কপর্দ্দিন!  আপনাকে আমরা নমস্কার করি। হে ত্রিনেত্র!  আপনি বেদপতি, আপনাকে আমাদের কোটি কোটি নমস্কার।২০

কার্য্যকারণরূপায় মূলপ্রকৃতিহেতবে।

ব্যাপ্যায় চ নমস্তুভ্যং ব্যাপকায় নমো নমঃ। ২১

হে প্রভো! আপনিই এই জগতের কারণ, আবার আপনিই কার্য্যরূপী; হে মূলপ্রকৃতিহেতো! আপনিই এই জগতের ব্যাপক, আবার আপনিই ব্যাপ্য, এহেন আপনাকে আমরা সদা অসংখ্য নমস্কার করি।'২

শিবলিঙ্গ পরমতত্ত্বঃ-

 


শিব মহাপুরাণের জ্ঞানসংহিতার জ্যোতির্লিঙ্গ প্রাদুর্ভাববর্ণনং নামক দ্বিতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত আছে- ব্রহ্মাবিষ্ণু উভয়ের বিবাদ শান্তি ও জ্ঞানোদয়ের জন্য উভয়ের মধ্যস্থলে সহস্র সহস্র জ্বালামালাসঙ্কুল কানানল-সন্নিভ একটি অদ্ভূত জ্যোতির্ম্ময় লিঙ্গ উদ্ভূত হইল। এই লিঙ্গের স্বরূপ হইল-

ক্ষয়-বৃদ্ধিবিনির্ম্মুক্তমাদিমধ্যান্তবর্জ্জিতম্।

অনৌপম্যমনির্দ্দিষ্টমব্যক্তং বিশ্বসম্ভবম্।। ৬৪

তাঁহার ক্ষয় বৃদ্ধি নাই, আদি মধ্য অন্ত নাই; তিনি অতুলনীয় অনির্দ্দেশ্য অব্যক্ত এবং জগতের মূল কারণ।৬৪

এই জ্ঞানসংহিতার তৃতীয় অধ্যায়ে শিবলিঙ্গকে ধ্যানমার্গেরও অগোচর বলা হইয়াছে-

'অনির্দ্দেশ্যঞ্চ তদ্রূপনাম কর্ম্মবর্জ্জিতম্।

অলিঙ্গং লিঙ্গতাং যাতং ধ্যানমার্গেহপ্যগোচরম্।। ৬

'এ কি! অনির্দ্দেশ্য, নামকর্ম্ম-বিবর্জ্জিত, এরূপ বস্তুতঃ লিঙ্গ না হইলেও লিঙ্গরূপে পরিণত হইয়াছে। ইহা ধ্যানমার্গেরও অগোচর। ৬

এই তৃতীয় অধ্যায়ে আরও বর্ণিত আছে- তখন তথায় আনন্দময় ওঙ্কারাত্মক সুব্যক্ত ত্রিমাত্র শব্দ সম্ভূত হইল।

লিঙ্গস্য দক্ষিণভাগে তদাপশ্যৎ সনাতনম্।১০

আদ্যং বর্ণমকারন্তু উকারঞ্চোত্তরে ততঃ।

মকারং মধ্যতশ্চৈব নাদান্তং তস্য চোমিতি।। ১১

সূর্য্যমণ্ডলবদ্দৃষ্ট্বা বর্ণমাদ্যন্তু দক্ষিণে।

উত্তরে পাবকপ্রখ্যমুকারমৃষিসত্তম।। ১২

শীতাংশুমণ্ডলপ্রখ্যং মকারং তস্য-মধ্যতঃ।

তস্যোপরি তদাপশ্যং স্ফটিকপ্রভবং পরম্।। ১৩

তুরীয়াতীতমমৃতং নিষ্কলং নিরুপপ্লবম্।

নির্দ্বন্দ্বং কেবলং তত্ত্বং বাহ্যাভ্যন্তরবর্জ্জিতম্।।১৪

আদিমধ্যান্তরহিতমানন্দস্যাপি কারণম্।

সত্যমানন্দমমৃতং পরং ব্রহ্ম পরায়ণম্।।১৫

তখন লিঙ্গের দক্ষিণভাগে সনাতন আদ্যবর্ণ অকার আমাদিগের দৃষ্টিগোচর হইল। তাঁহার উত্তরে উকার এবং মধ্যে নাদধ্বনিসমন্বিত মকার-আমরা এইরূপে ওঙ্কার অবলোকন করিলাম। হে ঋষিবর! আমরা লিঙ্গের দক্ষিণভাগে সূর্য্যমণ্ডলপ্রখ্য আদিবর্ণ, উত্তরভাগে অনল-সন্নিভ উকার এবং মধ্যে চন্দ্রমণ্ডলসমুজ্জ্বল মকার অবলোকন করিয়া তদুপরিভাগে স্ফটিক-প্রকাশ তুরীয়াতীত অমৃত নিষ্কল নির্দ্বন্দ্ব একমেবাদ্বিতীয়ং পরমতত্ত্ব দর্শন করিলাম; তাহার আদি, মধ্য, অন্ত নাই; বাহ্য অভ্যন্তর নাই; তিনি আনন্দময় আনন্দকারণ সত্য অজর পরব্রহ্ম এবং পরমগতি।১০-১৫

দেবাদিদেব শিবের অষ্টমূর্ত্তি সমূহ কথনঃ-

 


সেই দেবাদিবের অষ্টমূর্ত্তিময় এই নিখিল জগৎ সেই অষ্টমূর্ত্তিতে, সূত্রে মণিগণের ন্যায় ব্যাপিয়া রহিয়াছে।

শর্ব্বো ভবস্তথা রুদ্র উগ্রো ভীমঃ পশোঃপতিঃ।

ঈশানশ্চ মহাদেবো মূর্ত্ত্যয়শ্চাষ্ট বিশ্রুতাঃ।।১৮

অর্থাৎ  সেই সকল অষ্টসংখ্যক মূর্ত্তি শর্ব্ব, ভব, রুদ্র, উগ্র, ভীম, পশুপতি, ঈশান ও মহাদেব এই আট নামে প্রসিদ্ধ। ১৮

সেই শর্ব্বাদি অষ্টমূর্ত্তিই ক্ষিতি, জল, অনল, অনিল, আকাশ, ক্ষেত্রজ্ঞ, সূর্য্য ও চন্দ্রে যথাক্রমে অধিষ্ঠান করিতেছেন। ইহা শাস্ত্রনিশ্চয় যে , পরমাত্মা শর্ব্বের পৃথিবী-রূপিণী শর্ব্ব নামে মূর্ত্তি স্থাবর-জঙ্গমাত্মক বিশ্বকে ধারণ করিতেছেন। জল-রূপিণী ভব নামের দ্বিতীয় মূর্ত্তি সমস্ত জগতের জীবন রক্ষা করিতেছেন।  রুদ্রের অঘোর-রূপিণী শুভজনিকা তেজোময়ী রুদ্রাখ্যা মূর্ত্তি জগতের বাহিরে ও অন্তরে ব্যাপিয়া অধিষ্ঠান করিতেছেন। বেধা উগ্রের পবনাত্মিকা যে মূর্ত্তি এই বিশ্বকে স্পন্দিত করিয়া ধারণ করিতেছেন এবং স্বয়ং স্পন্দিত হইতেছেন, পণ্ডিতেরা সেই মূর্ত্তিকে উগ্র নামে আখ্যায়িত করেন।

সকলের অবকাশদায়িনী গগনময়ী ভীমের ভীমাখ্য মূর্ত্তি সকল ভূতের ভেদসাধন করত এই অখিল বিশ্বকে ব্যাপিয়া রহিয়াছেন।  সর্ব্বক্ষেত্র-নিবাসী সর্ব্ব-রূপী ক্ষেত্রজ্ঞের অধিষ্ঠাত্রী পশুপতি নাম্নী ষষ্ঠমূর্ত্তি পশুদিগের পাশবন্ধন ছেদন করিতেছেন। নিখিল জগতের দীপ্তিজনিকা দিবাকরস্বরূপা মহেশের ঈশানাখ্য মূর্ত্তি আকাশ ব্যাপিয়া অবস্থান করিতেছেন। আর শিবের সোমময়ী মহাদেবাখ্য মূর্ত্তি সুধাংশু-বর্ষণে অখিল ভুবনের আনন্দোৎপাদন করিতেছেন। ১৯-২৭

আত্মনশ্চাষ্টমী মূর্ত্তিঃ শিবস্য পরমাত্মনঃ।

ব্যাপিকেতরমূর্ত্তীনাং বিশ্বং তস্মাচ্ছিবাত্মকম্।২৮

অর্থাৎ পরমাত্মা শিবের ঐ অষ্টম্ মূর্ত্তি স্বীয় অপরমূর্ত্তিগুলিকে ব্যাপিয়া আছেন বলিয়া, বিশ্ব শিবাত্মক নামে প্রসিদ্ধ।২৮

-(শিবমহাপুরাণ, বায়বীয়সংহিতা, উত্তরভাগ, মহেশস্যাষ্টমূর্ত্তিত্বকথন নামক চতুর্থ অধ্যায়)

শিবোহহম্

 


অবধূত বললেন-"গুণ-বিগুণ বিভাগ যাঁর মধ্যে নেই, রতি-বিরতি বিহীন, নির্মল, নিষ্প্রপঞ্চ তিনি। গুণ-নির্গুণহীন, ব্যাপক, বিশ্বরূপ ব্যোমরূপ সেই শিবকে আমি কিভাবে বন্দনা করি? হে সুমিত্র! শ্বেতাদি বর্ণরহিত, যিনি নিজেই কার্য-কারণ, বিকল্পরহিত অমল শিবস্বরূপ, যাঁকে নিজের আত্মাতেই আমি আত্মরূপে দেখতে পাচ্ছি, তাঁকে কেমন করে নমস্কার জানাই?"

-(অবধূত গীতা, তৃতীয় অধ্যায়-১,২)

শিবলিঙ্গঃ-

 


মূলে ব্রহ্মা তথা মধ্যে বিষ্ণুস্ত্রিভুবনেশ্বরঃ।।

রুদ্রোপরি মহাদেবঃ প্রণবাখ্যঃ সদা শিবঃ।

লিঙ্গবেদী মহাদেবী ত্রিগুণাত্রিময়াত্মিকা।।

তথা চ পূজয়েদ্যস্তু দেবী দেবশ্চ পূজিতৌ।

-(লিঙ্গ মহাপুরাণ, পূর্বভাগ, চতুঃসপ্ততিতম অধ্যায়, ১৯-২১)

অর্থাৎ লিঙ্গের মূলে ব্রহ্মা, মধ্যে ত্রিভূবনেশ্বর বিষ্ণু, উপরে ওঙ্কাররূপী সদাশিব মহাদেব রুদ্র। ত্রিগুণাত্মিকা মহাদেবী হলেন লিঙ্গবেদি। যে ব্যক্তি বেদি সমেত লিঙ্গ পূজা করে, তার সর্ব দেবদেবীর পূজা ফল লাভ হয়।

ভগবৎলীলা-

 


ভগবানের লীলা মনুষ্যের চিন্তার অগোচর, দেহধারণ ও দেহত্যাগ উভয়ই তাহার লীলা মাত্র। মহাভারতকার মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ ব্যাস তাঁহার সেই অচিন্ত্য মাহাত্ম্য বর্ণনা করিয়া পুনঃপুনঃ সতর্ক করিয়া বলিতেছেন-

এবমেব মহাবাহুঃ কেশবঃ সত্যবিক্রমঃ। অচিন্ত্যঃ পুন্ডরীকাক্ষঃ নৈষকেবল-মানুষঃ।। -(মহাভারত,শান্তিপর্ব্ব,২০৭।৪৯)

স এব হি মহাবাহুঃ সর্ব্বলোক-নমস্কৃতঃ। অচ্যুতঃ পুন্ডরীকাক্ষঃ সর্ব্বভূতাদিরীশ্বরঃ।। -(মহাভারত,শান্তিপর্ব্ব,২০৯।৩৬)

অর্থাৎ এই সত্যবিক্রম মহাবাহু পুন্ডরীকাক্ষ কেশবের লীলা মনুষ্যের চিন্তার অগোচর। ইনি কেবল মানুষমাত্র নহেন, পরন্তু নরদেহধারী স্বয়ং ভগবান। ইনি সর্বলোকের নমস্য, সর্বভূতের আদিকারণ এবং সনাতন পুরুষ।

অনুগ্রহার্থং লোকানাং বিষ্ণুর্লোক-নমস্কৃতঃ। বসুদেবাত্তু দেবক্যাং প্রাদুর্ভূতো মহাযশাঃ।

পুরুষঃ স বিভুঃ কর্ত্তা সর্ব্বভূত পিতামহঃ।।--(মহাভারত,আদিপর্ব্ব,৬৩।৯৯)

অর্থাৎ জগতের কল্যাণের জন্য ভগবান বিষ্ণু বসুদেবের ঔরসে, দেবকীর গর্ভে আবির্ভূত হইয়াছেন। সেই পরমপুরুষ ভগবান সমগ্র জগতের কর্ত্তা এবং সমস্ত প্রাণীর পিতামহ।

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্য শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ভাষ্যে বলিতেছেন- মূর্খদের বাসুদেব বিষয়ে যে অনীশ্বর এবং অসর্বজ্ঞ আশঙ্কা-যাহা অর্জ্জুনের প্রশ্ন-তাহা পরিহার করিবার জন্য শ্রীভগবান স্বয়ং জ্ঞানযোগে বলিতেছেন-

শ্রীভগবানুবাচ।

বহুনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জ্জুন।

তান্যহং বেদ সর্ব্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ || ৫ ||

অজোহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোহপি সন্।

প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া || ৬ ||

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- শ্রীভগবান বলিতেছেন- হে অর্জ্জুন! আমার এবং তোমার বহু জন্মসকল ব্যতীত অর্থাৎ অতিক্রান্ত হইয়াছে, সেইসকল আমি জানি কিন্তু তুমি জান না, কারণ ধর্ম্ম-অধর্ম্ম অর্থাৎ পাপপূণ্যাদি মিথ্যা সংস্কারজন্য তোমার শুদ্ধ জ্ঞানশক্তি প্রতিবদ্ধ বা আবরিত। পরন্তু হে পরন্তপ! আমি নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্ত স্বভাবহেতু অনাবরণ জ্ঞানশক্তি এই জন্য আমি জানি।

আমি অজ অর্থাৎ জন্মরহিত হইয়াও; অব্যয়াত্মা অর্থাৎ যাঁহার জ্ঞানশক্তির ক্ষয় নাই এইরূপ অক্ষীণ জ্ঞানশক্তি স্বভাব হইয়াও; ব্রহ্মাদি থেকে তৃণ পর্য্যন্ত সর্ব্বভূতের ঈশ্বর হইয়াও; আমার যে স্বপ্রকৃতি, অর্থাৎ ত্রিগুণাত্মিকা বৈষ্ণবী মায়া, সমস্ত জগৎ যাহার বশে বর্তমান, যদ্দ্বারা মোহিত হইয়া লোকে নিজের আত্মা বাসুদেবকে জানিতে পারে না, সেই নিজ প্রকৃতিতে অধিষ্ঠিত হইয়া অর্থাৎ তাঁহাকে বশীভূত করিয়া আমি সম্ভাবিত হই অর্থাৎ আত্মমায়ার দ্বারা যেন লোকবৎ দেহধারণ করিয়া জন্মগ্রহণ করি; কিন্তু পরমার্থতঃ নহে।

শ্রীভগবানের সেই দিব্য-জন্ম কখন এবং কিজন্য? তাহাই বলিতেছন-

যদা যদা হি ধর্ম্মস্য গ্লানির্ভিবতি ভারত। অভ্যুত্থানধর্ম্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ || ৭ ||

পরিত্রাণায় সাধূনাম্ বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্। ধর্ম্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে || ৮ ||

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- হে ভারত! বর্ণাশ্রমাদিলক্ষণ প্রাণীদের অভ্যুদয়-নিঃশ্রেয়স সাধন ধর্ম্মের যখন যখনই গ্লানি অর্থাৎ হানি হয় এবং অধর্ম্মের অভ্যুত্থান হয় তখনই মায়ার দ্বারা নিজেকে সৃজন করি। সৎমার্গে স্থিত সাধুদের পরিত্রাণ অর্থাৎ পরিরক্ষণের জন্য ও দুষ্কৃত পাপকারীদের বিনাশের জন্য এবং ধর্ম্মের সম্যক্ স্থাপনের জন্য প্রতিযুগে আমি সম্ভাবিত হই।

উত্তমা ভক্তির স্বরূপ কি?

শ্রীভগবান কপিল বললেন-“একরূপ অবিকৃত মন যাঁর এইরূপ শুদ্ধচিত্ত ব্যক্তির গুরুমুখে উচ্চারিত শিষ্য কর্তৃক অনুশ্রুত বেদ বিহিত কর্ম্ম ও বিষয়সমূহ জ্ঞাত হয়  যাদের দ্বারা সেই সকল দ্যোতনশীল ইন্দ্রিয়গণের অথবা ইন্দ্রিয়গুলির অধিষ্ঠাতৃ দেবগণের সত্ত্বমূর্ত্তি শ্রীহরিতেই যে কামনাশূন্যা এবং স্বাভাবিক অযত্নসিদ্ধা যে বৃত্তি, তার নাম ভাগবতী ভক্তি। এই ভক্তি মুক্তি অপেক্ষা গরীয়সী।“

-(শ্রীধর স্বামী টীকা, শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ, তৃতীয় স্কন্ধ, পঞ্চবিংশ অধ্যায়-৩২)

ভগবানই সকল মধুরতার উৎস ও প্রকৃত বন্ধু

 


বেদ বলিতেছেন ভগবানই সকল মধুরতার উৎস ও প্রকৃত বন্ধু।

"উরুক্রমস্য স হি বন্ধুরিত্থা বিষ্ণোঃ পদে পরমে মধ্ব উৎসঃ।"

-(ঋগ্বেদ সংহিতা, ১ মণ্ডল, ১৫৪ সূক্ত, ৫ ঋক্)

অর্থাৎ সেই উরবিক্রমী (সর্বশক্তিমান শ্রেষ্ঠ) বিষ্ণুর পরমপদই সকল মধুরতার উৎস। তিনিই আমাদিগের প্রকৃত বন্ধু।

অন্যত্র আবার বলিতেছেন-

"তদ্বিপ্রাসো বিপন্যবো জাগৃবাংসঃ সমিন্ধতে। বিষ্ণোর্যৎ পরমং পদম্।"

-(ঋগ্বেদ সংহিতা, ১ মণ্ডল, ২২ সূক্ত, ২১ ঋক্)

ভাব এই যে, যাঁহারা মেধাবী, (বিষ্ণুর পরমপদে) ঐকান্তিক আসক্তিসম্পন্ন, স্তুতিবাদক অর্থাৎ ঐকান্তিক প্রার্থণাপরায়ণ এবং সদা জাগরূক অর্থাৎ অভ্রান্ত, তাঁহারাই সেই বিষ্ণুর পরমপদ প্রাপ্ত হন।

ভক্তি জ্ঞানের দ্বারস্বরূপঃ—

 


 

"ভগবান বাসুদেবে প্রযোজিত ভক্তিযোগ শীঘ্রই বৈরাগ্য ও অহৈতুকী জ্ঞান উৎপন্ন করে।"

-(শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ, প্রথম স্কন্ধ, দ্বিতীয় অধ্যায়-৭)

শ্রীধর স্বামী কৃত ভাবার্থ দীপিকাতে বর্ণিত আছে- শ্রুতিতে বলা হয়েছে যে- 'ব্রাহ্মণগণ নিত্য স্বাধ্যায়, যজ্ঞ, দান ও যদৃচ্ছালাভে সন্তোষরূপ তপস্যা দ্বারা তাঁকে জানতে ইচ্ছা করেন'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৪।২২) সুতরাং ধর্ম যে জ্ঞানের অঙ্গ- এটি এই শ্রুতিবচন থেকে প্রতিপাদিত হল। তাহলে সেই ধর্মকে ভক্তির হেতু বলা হলো কিভাবে? উত্তরে বলা হলো, সত্য বটে, তবে ঐ জ্ঞান ভক্তির মাধ্যমেই হয়ে থাকে- সুতরাং ভক্তি জ্ঞানের দ্বারস্বরূপ। সেজন্যই বলা হয়েছে 'বাসুদেবে' ইত্যাদি। অহৈতুক বলায় ভগবান শুষ্কতর্কের অগোচর তা বোঝানো হলো। কেবল ঔপনিষৎ জ্ঞানেই তাঁর স্বরূপ উপলব্ধি করা যায়।

.........................................................................

শ্রীশুভ চৌধুরী।

নভেম্বর ১৫, ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ।

কার্ত্তিকেয় দিব্য নামাবলীঃ—

 


মহাভারতের বনপর্বের মার্কণ্ডেয়সমস্যাপর্ব্বাধ্যায়ের একত্রিংশদধিক-দ্বিশততম অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-যুধিষ্ঠির কহিলেন-'হে তপোধন! আপনি স্কন্দদেবের ভুবনবিখ্যাত নামসকল কীর্ত্তন করিয়া আমার কৌতুহল চরিতার্থ করুন।'

মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরের বাক্য শ্রবণ করিয়া কার্ত্তিকেয়ের নামাবলী বলিতে আরম্ভ করিলেন-'আগ্নেয়, স্কন্দ, দীপ্তকীর্ত্তি, অনাময়, ময়ূরকেতু, ধর্ম্মাত্মা, ভূতেশ, মহিষার্দ্দন, কামজিৎ, কামদ, কান্ত, সত্যবাক্, ভুবনেশ্বর, শিশু, শুচি, চণ্ড, দীপ্তবর্ণ, শুভানন, অমোঘ, অনঘ, রৌদ্র, প্রিয়, চন্দ্রানন, দীপ্তশক্তি, প্রশান্তাত্মা, ভদ্রকৃৎ, কূটমোহন, ষষ্ঠীপ্রিয়, পবিত্র, মাতৃবৎসল, কন্যা-ভর্ত্তা, বিভক্তা, স্বাহেয়, রেবতীসুত, প্রভু, নেতা, নৈগমেয়, সুদুশ্চর, বিশাখ, সুব্রত, ললিত, বালক্রীড়-নক প্রিয়, খচারী, ব্রহ্মচারী, শূর, শরজন্মা, বিশ্বামিত্রপ্রিয়, দেবসেনাপ্রিয়, বাসুদেবপ্রিয় ও প্রিয়কৃৎ।' কার্ত্তিকেয়ের এই দিব্য-নাম সকল কীর্ত্তন করিলে ঐশ্বর্য্য ও স্বর্গলাভ হয়, তাহাতে সন্দেহ নাই।

হে যুধিষ্ঠির! এক্ষণে আমি দেবঋষিগণের সহিত একত্র হইয়া তাঁহার স্তব করি। হে স্কন্দ! তুমি ব্রহ্মপ্রিয়, ব্রাহ্মণের ন্যায় ব্রতধারী, ব্রহ্মজ্ঞ ও ব্রাহ্মণগণের নেতা, তুমি স্বহা, তুমি স্বধা, তুমি পরম পবিত্র, মন্ত্রসকল তোমারই স্তব করিয়া থাকে। তুমিই বিখ্যাত হুতাশন. তুমিই সংবৎসর, ষড়ঋতু, মাস, অর্ধ্বমাস, অয়ন ও দিক্। হে রাজীবলোচন! তুমি সহস্রমুখ ও সহস্রবাহু, তুমি লোকসকলের পাতা, তুমি পরম পবিত্র হবিঃ, তুমিই সুরাসুরগণের শুদ্ধিকর্ত্তা, তুমি সেনাগণের অধিপতি, তুমিই প্রচণ্ড প্রভু ও শত্রুগণের জেতা, তুমিই সহস্রভূ, তুমিই পৃথিবী, তুমিই সহস্র তুষ্টি, তুমিই সহস্রভুক্ ও সহস্রশীর্ষ, তুমি অনন্তরূপ, তুমি সহস্রপাৎ, তুমিই গুরুশক্তিধারী।

হে দেব! গঙ্গা, স্বহা, মহী ও কৃত্তিকাগণ তোমার মাতা, কুক্কুট তোমার ক্রীড়নক, তুমি ইচ্ছামত বিবিধরূপ ধারণ করিতে সমর্থ। তুমি দক্ষ, তুমি সোম, সমীরণ, ধর্ম্ম. গিরিন্দ্র ও সহস্রলোচন, তুমি সনাতনের সনাতন, প্রভুর প্রভু, তুমি সত্যের কর্ত্তা ও দানবগণের হর্ত্তা, তুমি রিপুগণের জেতা ও সূরগণের শ্রেষ্ঠ, তুমি পরমসূক্ষ্ম তপঃস্বরূপ, তুমি পরাপরের অভিজ্ঞ এবং তুমি স্বয়ংই সেই পরাপর। হে সূরবীর! তোমারই ধর্ম্ম, কাম, শক্তিসমুদয় জগৎ ব্যাপ্ত করিয়া আছে। আমি তোমাকে স্তব করিতেছি। হে লোকনাথ! তোমাকে নমস্কার।

..............................................................................

শ্রীশুভ চৌধুরী

নভেম্বর ১৭, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ।

ভাগবতে অদ্বৈতবেদান্তোক্ত দৃগ্-দৃশ্যবিবেক ও প্রতিবিম্ববাদ—

  সনৎকুমার মোক্ষের সাধন উপদেশ করতে গিয়ে বলছেন — দগ্ধাশয়ো মুক্তসমস্ততদ্গুণো নৈবাত্মনো বহিরন্তর্বিচষ্টে । পরাত্মনোর্যদ্ব্যবধানং...