ভগবানের
লীলা মনুষ্যের চিন্তার অগোচর, দেহধারণ ও দেহত্যাগ উভয়ই তাহার লীলা মাত্র। মহাভারতকার
মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ ব্যাস তাঁহার সেই অচিন্ত্য মাহাত্ম্য বর্ণনা করিয়া পুনঃপুনঃ সতর্ক
করিয়া বলিতেছেন-
এবমেব
মহাবাহুঃ কেশবঃ সত্যবিক্রমঃ। অচিন্ত্যঃ পুন্ডরীকাক্ষঃ নৈষকেবল-মানুষঃ।। -(মহাভারত,শান্তিপর্ব্ব,২০৭।৪৯)
স
এব হি মহাবাহুঃ সর্ব্বলোক-নমস্কৃতঃ। অচ্যুতঃ পুন্ডরীকাক্ষঃ সর্ব্বভূতাদিরীশ্বরঃ।।
-(মহাভারত,শান্তিপর্ব্ব,২০৯।৩৬)
অর্থাৎ
এই সত্যবিক্রম মহাবাহু পুন্ডরীকাক্ষ কেশবের লীলা মনুষ্যের চিন্তার অগোচর। ইনি কেবল
মানুষমাত্র নহেন, পরন্তু নরদেহধারী স্বয়ং ভগবান। ইনি সর্বলোকের নমস্য, সর্বভূতের আদিকারণ
এবং সনাতন পুরুষ।
অনুগ্রহার্থং
লোকানাং বিষ্ণুর্লোক-নমস্কৃতঃ। বসুদেবাত্তু দেবক্যাং প্রাদুর্ভূতো মহাযশাঃ।
পুরুষঃ
স বিভুঃ কর্ত্তা সর্ব্বভূত পিতামহঃ।।--(মহাভারত,আদিপর্ব্ব,৬৩।৯৯)
অর্থাৎ
জগতের কল্যাণের জন্য ভগবান বিষ্ণু বসুদেবের ঔরসে, দেবকীর গর্ভে আবির্ভূত হইয়াছেন। সেই
পরমপুরুষ ভগবান সমগ্র জগতের কর্ত্তা এবং সমস্ত প্রাণীর পিতামহ।
ভগবৎপাদ্
শঙ্করাচার্য্য শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ভাষ্যে বলিতেছেন- মূর্খদের বাসুদেব বিষয়ে যে অনীশ্বর
এবং অসর্বজ্ঞ আশঙ্কা-যাহা অর্জ্জুনের প্রশ্ন-তাহা পরিহার করিবার জন্য শ্রীভগবান স্বয়ং
জ্ঞানযোগে বলিতেছেন-
শ্রীভগবানুবাচ।
বহুনি
মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জ্জুন।
তান্যহং
বেদ সর্ব্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ || ৫ ||
অজোহপি
সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোহপি সন্।
প্রকৃতিং
স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া || ৬ ||
শাঙ্করভাষ্য
অনুসারে ভাবার্থঃ- শ্রীভগবান বলিতেছেন- হে অর্জ্জুন! আমার এবং তোমার বহু জন্মসকল ব্যতীত
অর্থাৎ অতিক্রান্ত হইয়াছে, সেইসকল আমি জানি কিন্তু তুমি জান না, কারণ ধর্ম্ম-অধর্ম্ম
অর্থাৎ পাপপূণ্যাদি মিথ্যা সংস্কারজন্য তোমার শুদ্ধ জ্ঞানশক্তি প্রতিবদ্ধ বা আবরিত।
পরন্তু হে পরন্তপ! আমি নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্ত স্বভাবহেতু অনাবরণ জ্ঞানশক্তি এই জন্য
আমি জানি।
আমি
অজ অর্থাৎ জন্মরহিত হইয়াও; অব্যয়াত্মা অর্থাৎ যাঁহার জ্ঞানশক্তির ক্ষয় নাই এইরূপ অক্ষীণ
জ্ঞানশক্তি স্বভাব হইয়াও; ব্রহ্মাদি থেকে তৃণ পর্য্যন্ত সর্ব্বভূতের ঈশ্বর হইয়াও; আমার
যে স্বপ্রকৃতি, অর্থাৎ ত্রিগুণাত্মিকা বৈষ্ণবী মায়া, সমস্ত জগৎ যাহার বশে বর্তমান,
যদ্দ্বারা মোহিত হইয়া লোকে নিজের আত্মা বাসুদেবকে জানিতে পারে না, সেই নিজ প্রকৃতিতে
অধিষ্ঠিত হইয়া অর্থাৎ তাঁহাকে বশীভূত করিয়া আমি সম্ভাবিত হই অর্থাৎ আত্মমায়ার দ্বারা
যেন লোকবৎ দেহধারণ করিয়া জন্মগ্রহণ করি; কিন্তু পরমার্থতঃ নহে।
শ্রীভগবানের
সেই দিব্য-জন্ম কখন এবং কিজন্য? তাহাই বলিতেছন-
যদা
যদা হি ধর্ম্মস্য গ্লানির্ভিবতি ভারত। অভ্যুত্থানধর্ম্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্
|| ৭ ||
পরিত্রাণায়
সাধূনাম্ বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্। ধর্ম্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে || ৮ ||
শাঙ্করভাষ্য
অনুসারে ভাবার্থঃ- হে ভারত! বর্ণাশ্রমাদিলক্ষণ প্রাণীদের অভ্যুদয়-নিঃশ্রেয়স সাধন ধর্ম্মের
যখন যখনই গ্লানি অর্থাৎ হানি হয় এবং অধর্ম্মের অভ্যুত্থান হয় তখনই মায়ার দ্বারা নিজেকে
সৃজন করি। সৎমার্গে স্থিত সাধুদের পরিত্রাণ অর্থাৎ পরিরক্ষণের জন্য ও দুষ্কৃত পাপকারীদের
বিনাশের জন্য এবং ধর্ম্মের সম্যক্ স্থাপনের জন্য প্রতিযুগে আমি সম্ভাবিত হই।