Sunday, 17 March 2024

হরিনাম সঙ্কীর্তনঃ-

 


হরিনাম সঙ্কীর্তন কলিতে সর্বাভীষ্ট লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়। বিষ্ণুপুরাণে বলা হয়েছে, ধ্যায়ন্ কৃতে যজন্ যজ্ঞৈস্ত্রেতায়াং দ্বাপরেঽর্চ্চয়ন্। যদাপ্নোতি তদাপ্নোতি কলৌ সঙ্কীর্ত্ত্য কেশবম্।।ইতি বিষ্ণুপুরাণে (//১৭)

অর্থাৎ সত্যযুগে ধ্যান দ্বারা, ত্রেতাযুগে যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা, দ্বাপরে পূজার্চনা দ্বারা মানুষ যা লাভ করেছে, কলিযুগে হরিনাম সঙ্কীর্তন দ্বারা সেই একই ফল অতি সহজেই প্রাপ্ত হওয়া যায়।

নাম যজ্ঞে একান্তচিত্তে অকপটে যে সুবুদ্ধি সজ্জন ভগবানের আরাধনা করবেন, তিনিই শ্রীকৃষ্ণপদ প্রাপ্ত হবেন৷ স্বয়ং ভগবান্ শ্রীগীতায় বলেছেন"যজ্ঞানাং জপযজ্ঞোঽস্মি"-(১০/২৫) অর্থাৎ যজ্ঞসমূহের মধ্যে আমি জপ যজ্ঞ। ভগবান্ আদিপুরুষ নারায়ণের নাম সমস্ত শ্রুতির গূঢ় রহস্য যা শ্রবণ উচ্চারণমাত্রেই কলিযুগের সমস্ত দোষের বিনাশ হয়। এই ভগবৎ নামজপ কীর্তন সংসার সাগর পারের তরী। কলিসন্তরণ উপনিষদে বর্ণিত আছে—"সর্বশ্রুতিরহস্যং গোপ্যং তচ্ছৃণু যেন কলিসংসারং তরিষ্যসি। ভগবৎ আদিপুরুষস্য নারায়ণস্য নামোচ্চারণমাত্রেণ নির্ধূতকলির্ভবতি।"

এই উপনিষদেই দেবর্ষি নারদ পিতামহ ব্রহ্মাকে প্রশ্ন করছেন, 'পিতামহ! সেই নাম কি?’ তার উত্তরে হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মা বললেন

"হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।"

ইতি ষোড়শকং নাম্নাং কলিকল্মষনাশনম্। নাতঃ পরতরোপায়ঃ সর্ববেদেষু দৃশ্যতে। ইতি ষোড়শকলাবৃতস্য জীবস্যাবরণবিনাশনম্। ততঃ প্রকাশতে পরম্ ব্রহ্ম মেঘাপায়ে রবিরশ্মিমণ্ডলীবেতি।।

অর্থাৎ ভগবানের এই ১৬ নাম কলিকালের পাপনাশক। এর থেকে শ্রেষ্ঠ উপায় চতুর্বেদেও দৃষ্টিগোচর হয় না। এই ১৬ নামের দ্বারা জীবের ১৬ কলায় আবৃত আবরণের সমাপ্তি ঘটে। যেমন করে মেঘাচ্ছন্ন সূর্য মেঘ অপসারিত হলে সূর্যকিরণ প্রকাশিত হতে থাকে তদ্রূপ জীবও সেই পরম ব্রহ্মস্বরূপ এই ভাব উপলব্ধি করতে থাকে।

দেবর্ষি নারদ পুনরায় প্রশ্ন করলেনহে প্রভু! এই নাম মন্ত্র জপের বিধি (নিয়ম) কি? ব্রহ্মা বললেন

"তং হোবাচ নাস্য বিধিরিতি। সর্বদা শুচিরশুচির্বা পঠন্ব্রাহ্মণঃ সলোকতাং সমীপতাং সরূপতাং সাযুজ্যতামেতি।" অর্থাৎ এই মন্ত্র জপের কোন বিধি নেই। শুচি অথবা অশুচি, যেকোন পরিস্থিতিতে এই নামমন্ত্র সর্বদা জপ করে যে ব্যাক্তি, তিনি সালোক্য, সামীপ্য, সারূপ্য এবং সাযুজ্য তথা সকল প্রকারের মুক্তিকে প্রাপ্ত হতে পারে।

খৃষ্টীয় চতুর্দশ শতকে প্রেমের অবতার মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব এই নামমন্ত্রটির বহুল প্রচার প্রসার করে সর্বসাধারণের জন্য মন্ত্রটি উন্মুক্ত করেন। এইক্ষেত্রে নামমন্ত্রটির বিপরীত ক্রম পরিলক্ষিত হয়। যথা

"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।

হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।"........

শ্রীশুভ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি , ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

Wednesday, 6 March 2024

নারায়ণসূক্তম্

 


নারায়ণসূক্তম্

সহস্র শীর্ষং দেবং বিশ্বাক্ষং বিশ্বশংভুবম্

বিশ্বৈ নারায়ণং দেবং অক্ষরং পরমং পদম্ ॥১

ভাবার্থঃ-অনন্তমস্তক, অনন্তচক্ষু, নিখিল মঙ্গলের নিদান, জগদাত্মা, সর্বদেবস্বরূপ, বিকারহীন, পরমপ্রভু স্বয়ংপ্রকাশ নারায়ণকে ধ্যান করি।১

বিশ্বতঃ পরমান্নিত্যং বিশ্বং নারায়ণং হরিম্

বিশ্বং এব ইদং পুরুষঃ তদ্বিশ্বং উপজীবতি ॥২

ভাবার্থঃ-জড়বর্গ হইতে উৎকৃষ্ট, নিত্য, সর্বাত্মক, পাপ অজ্ঞানের নাশক নারায়ণকে ধ্যান করি; এই বিশ্ব বস্তুতঃ পরমাত্মাই; সেই বিশ্বকে পরমাত্মা নিজ ব্যবহারার্থ আশ্রয় করেন।২

পতিং বিশ্বস্য আত্মা ঈশ্বরং শাশ্বতং শিবমচ্যুতম্

নারায়ণং মহাজ্ঞেয়ং বিশ্বাত্মানং পরায়ণম্ ॥৩

ভাবার্থঃ- জগতের পালক, জীববর্গের নিয়ন্তা, নিত্য বর্তমান, পরম মঙ্গল, বিচ্যুতিশূন্য, সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞেয়, জগতের আত্মা সর্বোত্তম আশ্রয় নারায়ণকে ধ্যান করি।৩

নারায়ণ পরো জ্যোতিরাত্মা নারায়ণঃ পরঃ

নারায়ণ পরং ব্রহ্ম তত্ত্বং নারায়ণঃ পরঃ

নারায়ণ পরো ধ্যাতা ধ্যানং নারায়ণঃ পরঃ ॥৪

ভাবার্থঃ-নারায়ণই উত্তম ব্রহ্মতত্ত্ব; নারায়ণই স্বরূপতঃ পরব্রহ্ম; নারায়ণ পরম জ্ঞানস্বরূপ; নারায়ণ পরমাত্মা; নারায়ণেরই ধ্যান হইয়া থাকে, এবং ধ্যানও সর্বোত্তম নারায়ণ।৪

য়চ্চ কিংচিৎ জগৎ সর্বং দৃশ্যতে শ্রূয়তেঽপি বা

অংতর্বহিশ্চ তৎসর্বং ব্যাপ্য নারায়ণঃ স্থিতঃ ॥৫

ভাবার্থঃ- যাহা কিছু জাগতিক বস্তু দৃষ্ট বা শ্রুত হয়, সেই সমস্তকে অন্তরে এবং বাহিরে ব্যপ্ত করিয়া নারায়ণ বর্তমান আছেন।৫

অনন্তং অব্যয়ং কবিং সমুদ্রেন্তং বিশ্বশংভুবম্

পদ্ম কোশ প্রতীকাশং হৃদয়ং অপি অধোমুখম্ ॥৬

ভাবার্থঃ-অনন্ত, বিনাশরহিত, সর্বজ্ঞ, সংসারসাগরের অন্তস্বরূপ এবং সকল সুখের কারণকে উপসনা করি। হৃদয়দেশ পদ্মের মধ্যস্থলের ন্যায়; কিন্তু উহা অধোমুখ।৬

অধো নিষ্ঠ্যা বিতস্ত্যান্তে নাভ্যাম্ উপরি তিষ্ঠতি

জ্বালামালাকুলং ভাতী বিশ্বস্যায়তনং মহত্ ॥৭

ভাবার্থঃ- গ্রীবাসংযোগের নিম্নে নাভিদেশ হইতে দ্বাদশ অঙ্গুলি পরিমিত স্থান উর্ধ্বে উক্ত হৃদয় বিদ্যমান আছে বলিয়া জানিবে; উহা বিশ্বের মহৎ আয়তন।৭

সন্ততং শিলাভিস্তু লম্বত্যা কোশসন্নিভম্

তস্যান্তে সুষিরং সূক্ষ্মং তস্মিন্ সর্বং প্রতিষ্ঠিতম্ ॥৮

ভাবার্থঃ-পদ্মমুকুলসদৃশ হৃদয় নাড়ীসমূহের দ্বারা পরিব্যপ্ত হইয়া লম্বিত রহিয়াছে; তাহার সমীপে সূক্ষ্ম ছিদ্র আছে; ছিদ্রমধ্যে এই সমস্ত জগৎ প্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ সর্বজগৎকারণ ব্রহ্ম অনুভূত হন।৮

তস্য মধ্যে মহানগ্নিঃ বিশ্বার্চিঃ বিশ্বতো মুখঃ

সোঽগ্রবিভজংতিষ্ঠন্ আহারং অজরঃ কবিঃ

তির্যগূর্ধ্বমধশ্শায়ী রশ্ময়ঃ তস্য সন্ততা।৯

ভাবার্থঃ- ছিদ্রমধ্যে বহুশিখাযুক্ত, বহুরূপযুক্ত বিশাল অগ্নি আছেন; সেই অগ্নি সম্মুখে প্রাপ্ত অন্ন আহার করেন; তিনি ভুক্ত অন্নকে সর্বায়বে প্রসারিত করিয়া অবস্থিত থাকিলেও স্বয়ং জীর্ণ হন না; সুতরাং তিনিই দেহের সর্বত্র প্রসারিত জ্ঞাতা এবং তাঁহারই চৈতন্য দেহের সর্বত্র ব্যাপ্ত।৯

সন্তাপয়তি স্বং দেহমাপাদতলমাস্তকঃ

তস্য মধ্যে বহ্নিশিখা অণীয়োর্ধ্বা ব্যবস্থিতাঃ ॥১০

ভাবার্থঃ- তিনি স্বীয় দেহকে আপাদমস্তক উত্তাপিত করেন। উক্ত অগ্নির একটি অতিসূক্ষ্ম শিখা ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত প্রসারিত আছে। ১০

নীলতোয়দ-মধ্যস্থ-দ্বিদ্যুল্লেখেব ভাস্বরা

নীবারশূকবত্তন্বী পীতা ভাস্বত্যণূপমা ॥১১

ভাবার্থঃ-উক্ত শিখা নীল মেঘের মধ্যস্থ বিদ্যুৎরেখার ন্যায় উজ্জল, নীবার বীজের শিষের ন্যায় সূক্ষ্ম, উহা পীতবর্ণ, দীপ্তিমান অতিসূক্ষ্ম অণুর তুল্য।১১

তস্যাঃ শিখায়া মধ্যে পরমাত্মা ব্যবস্থিতঃ

ব্রহ্ম শিবঃ হরিঃ ইন্দ্রঃ সোঽক্ষরঃ পরমঃ স্বরাট্ ॥১২

ভাবার্থঃ-সেই শিখার মধ্যে পরমাত্মা বিশেষরূপে প্রকটিত, তিনিই ব্রহ্মা, তিনিই শিব, তিনিই হরি, তিনিই ইন্দ্র, তিনিই অন্তর্যামী ঈশ্বর এবং মায়াতীত স্বপ্রকাশ।১২

ঋতং সত্যং পরং ব্রহ্ম পুরুষং কৃষ্ণ পিঙ্গলম্

ঊর্ধ্বরেতং বিরূপাক্ষং বিশ্বরূপায় বৈ নমো নমঃ

যিনি পরব্রহ্ম তিনিই পারমার্থিক সত্যস্বরূপ; তিনি পুরুষাকার কৃষ্ণবর্ণ পিঙ্গলবর্ণ, ঊর্ধ্বরেতা এবং ত্রিনেত্র; সেই বিশ্বরূপকে নমস্কার।

নারায়ণায় বিদ্মহে বাসুদেবায় ধীমহি

তন্নো বিষ্ণুঃ প্রচোদয়াত্

শান্তি শান্তি শান্তিঃ


তৈত্তিরীয়ারণ্যকম্, প্রপাঠকঃ - ১০  অনুবাকঃ - ১৩

মান ও অপমান যখন যোগীর নিকট বিপরীতার্থ হয় তখনই তা সিদ্ধিপ্রদ হয়ে থাকেঃ-



ভগবান্ দত্তাত্রেয় বলেছেন

মানাপমানৌ যাবেতৌ প্রাপ্ত্যুদ্বেগকরৌ নৃণাম্।

তাবেব বিপরীতার্থৌ যোগিনঃ সিদ্ধিকারকৌ।।

মানাপমানৌ যাবেতৌ তাবেবাহুবিষামৃতে।

অপমানোহমৃতং তত্র মানস্তু বিষমং বিষম্।।

-(মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ৪১তম অধ্যায়- ,)

মান অপমান, এই উভয়েই সকলের প্রাপ্তি উদ্বেগের কারণ। যদি এই দুইটি যোগীর নিকট বিপরীতার্থ হয় তাহা হইলেই সিদ্ধিপ্রদ হইয়া থাকে। মান অপমান, এই দুইটি বিষ অমৃত বলিয়া কীর্ত্তিত; উহার মধ্যে অপমান অমৃত মানই বিষম বিষ।....

শ্রীশুভ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি , ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক শিবলিঙ্গ পূজার মাহাত্ম্য কথনঃ-

 


শ্রীভগবানুবাচ।

লিঙ্গার্চ্চনাৎ পুণ্যং লোকে দুর্গতিনাশনম্।

তথা লিঙ্গে হিতায়ৈষাং লোকানাং পূজয়েচ্ছিবম্।।

যোহহং তল্পিঙ্গমিত্যাহুর্বেদবাদবিদো জনাঃ।

ততোহহমাত্মনীশানাং পূজয়াম্যাত্মনৈব তু।।

তস্যৈব পরমা মূর্ত্তিস্তন্ময়োহহং সংশয়ঃ।

নাবয়োর্বিদ্যতে ভেদো বেদেষ্বেবং বিনিশ্চয়ঃ।।

এষ দেবো মহাদেবঃ সদা সংসারভীরুভিঃ।

ধ্যেয়ঃ পূজ্যশ্চ বন্দ্যশ্চ জ্ঞেয়ো লিঙ্গে মহেশ্বরঃ।।

—(কূর্ম্মপুরাণ, পূর্ব্বভাগ, ষড়বিংশ অধ্যায়, ৫৮-৬১)

শ্রীভগবান্ বলছেন— "লিঙ্গার্চনা অপেক্ষা লোকমধ্যে আর পূণ্যকর কিছু নাই এবং দুর্গতিনাশেরও অপর কোন উপায় নাই; অতএব এই সমস্ত লোকের হিতের জন্য লিঙ্গে শিবের পূজা করিবে। বেদতত্ত্বজ্ঞ পণ্ডিতেরা আমাকেই সেই শিবলিঙ্গ বলিয়া থাকেন, অতএব আমিই স্বয়ং আমাতে মহাদেবের পূজা করিতেছি। আমিই সেই শিবের পরমা মূর্ত্তি এবং আমিই শিবময়, আমাদের উভয়ের মধ্যে কোন প্রভেদ নাই, বেদে ইহাই নিশ্চিত হইয়াছে। অতএব সংসারভীরু লোকেরা সর্ব্বদাই লিঙ্গে সেই মহেশ্বরের ধ্যান, পূজা বন্দনা করিবে।"

শ্রীশুভ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

ভাগবতে অদ্বৈতবেদান্তোক্ত দৃগ্-দৃশ্যবিবেক ও প্রতিবিম্ববাদ—

  সনৎকুমার মোক্ষের সাধন উপদেশ করতে গিয়ে বলছেন — দগ্ধাশয়ো মুক্তসমস্ততদ্গুণো নৈবাত্মনো বহিরন্তর্বিচষ্টে । পরাত্মনোর্যদ্ব্যবধানং...