Wednesday, 21 June 2023

ভাগবতে আত্মার নির্বিকার-স্বরূপতা বর্ণনঃ-

 


শ্রীমদ্ভাগবতের একাদশ স্কন্ধের ২৮শ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে

এষ স্বয়ঞ্জ্যোতিরজোঽপ্রমেয়ো মহানুভূতিঃ সকলানুভূতিঃ। একোঽদ্বিতীয়ো বচসাং বিরামে

যেনেষিতা বাগসবশ্চরন্তি॥ ৩৫॥

এই স্বয়ংজ্যোতি (স্বপ্রকাশ), জন্মরহিত, অপ্রমেয় অর্থাৎ প্রত্যক্ষাদি প্রমাণের অগোচর, মহানুভূতি (চিদ্ঘন অর্থাৎ দেশ বা কালের দ্বারা পরিচ্ছিন্ন নয় বলিয়া, উহার অস্তিত্ব বৃদ্ধি বিপরিণাম অপক্ষয় এবং বিনাশরূপ বিকারের সম্ভাবনা নাই), সকলানুভূতি (সর্বজ্ঞ), এক অদ্বিতীয় আত্মা আছেন। বাক্যের দ্বারা তাঁহাকে বর্ণনা করা যায় না। তাঁহার দ্বারা প্রেরিত হইয়া বাক্য এবং ইন্দ্রিয়সমূহ স্বস্ববিষয়ে প্রবৃত্ত হয়।

'একঃ' এবং 'অদ্বিতীয়ঃ' পদ দুইটির দ্বারা আত্মার সকল প্রকার ভেদ নিষিদ্ধ হইল। এবং এক অদ্বিতীয় আত্মায় ভেদকল্পনা যে অজ্ঞানপ্রসূত তা পরবর্তীতে বর্ণিত হইতেছে। যথা

এতাবানাত্মসম্মোহো যদ্বিকল্পস্তু কেবলে।

আত্মন্নৃতে স্বমাত্মানমবলম্বো যস্য হি॥ ৩৬॥

অর্থাৎ এক অদ্বিতীয় আত্মাতে যে ভেদভাবের প্রতীতি হয় উহা মনের ভ্রম মাত্র। কারণ আত্মা হইতে অন্য ভেদজ্ঞানের আশ্রয় নাই। শুক্তিতে যে রজত ভ্রম হয় সেই ভ্রমজ্ঞানের আশ্রয় শুক্তি; শুক্তি ব্যতীত দ্বিতীয় কোন পদার্থ ভ্রমজ্ঞানের পূর্বে, সময়ে বা ভ্রমজ্ঞান চলিয়া যাওয়ার পর থাকে না।.........

শ্রীশুভ চৌধুরী

জানুয়ারি ৩১, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

ভাগবতে জীবের ব্রহ্মস্বরূপতার কথন—

 


শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধের তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত আছে

যত্রেমে সদসদ্রূপে প্রতিষিদ্ধে স্বসম্বিদা

অবিদ্যয়াঽঽত্মনি কৃতে ইতি তদ্ব্রহ্মদর্শনম্ ৩৩॥

অর্থাৎ যখন স্বরূপের সম্যক্ জ্ঞানপ্রাপ্তির প্রভাবে অবিদ্যার দ্বারা পরমাত্মায় আরোপিত স্থূলসূক্ষ্মরূপ সম্বন্ধ প্রতিষিদ্ধ হয় তখন জীবের ব্রহ্মদর্শন হয়।

পূজ্যপাদ্ শ্রীধর স্বামী 'ভাবার্থদীপিকা' টীকায় বলছেনসেই উপাধিদ্বয়ের (স্থূল-সূক্ষ্ম) আরোপ অর্থাৎ অধ্যাস পূর্বে বলে এসে এখন তার অপবাদের দ্বারা জীবের ব্রহ্মস্বরূপতার কথা বলা হচ্ছে—"যত্রেমে" ইত্যাদি শ্লোকে। যখন এই স্থূল-সূক্ষ্ম রূপ দুটি সম্যক্ স্বরূপজ্ঞানের দ্বারা বাধিত হয়। জ্ঞানের দ্বারা প্রতিষেধযোগ্যত্ব বোঝাতে হেতু বলা হলো, 'অবিদ্যয়া আত্মনি'—মায়ার দ্বারা পরমাত্মায় আরোপিত স্থূল সূক্ষ্মদেহএই হেতু। (অবিদ্যা বিদ্যার দ্বারা দূরীভূত হয়, কারণ জ্ঞানই বিদ্যা) 'তদ্ ব্রহ্মদর্শনম্তদা জীবো ব্রহ্মৈব ভবতীতি ইত্যর্থঃ' অর্থাৎ অবিদ্যা দূরীভূত হলে তখন জীব, ব্রহ্মই হয়। সেটি কেমন? বলা হলো—'জ্ঞানৈকস্বরূপম্'—জ্ঞানই একমাত্র স্বরূপ।........

শ্রীশুভ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি , ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

ব্যাসগীতায় ধর্ম কথন—


 

ভগবান্ ব্যাসদেবের এই অপূর্ব ধর্মোপদেশের কিঞ্চিৎ অংশ আজ পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি। ভগবান্ ব্যাস বলছেন— "গৃহে বাস করলেই কেউ গৃহস্থ হয় না, গৃহস্থ তাকেই বলা যায় যে সবসময়ই বিভাগশীল অর্থাৎ পরিবার পরিজনদের সঙ্গে সবকিছু সমভাবে ভাগ করে নিতে জানে, ক্ষমাশীল দয়ালু। আক্ষেপ, অনাদর, তিরস্কার, হিংসা, বন্ধন, কারো দ্বারা বধের উদ্যোগ বা নানা দোষারোপ সহ্য করার নামই ক্ষমা। পরদুঃখকে নিজের দুঃখ জ্ঞানে বন্ধুভাবে গ্রহণ করে করুণা করার নাম দয়া। এই দয়াকেই মুনিরা বলেছেন সাক্ষাৎ ধর্ম-সাধন।

নিজের সমান অথবা নিজের অধিক গুণ যার মধ্যে আছে, তার সঙ্গে মিত্রতা করবে। কোন ভাল কাজ করে 'আমি অমুক কাজ করেছি' বলে প্রচার করবে না; আবার কোন অপকর্ম বা পাপ কাজ করে তা কখনো গোপন রাখবে না। এমন কাজ করবে, যাতে মানুষের ভালো হয়, নিজেরও মঙ্গল হয়। নিজের যেমন বয়স, বয়স-অনুযায়ী যতখানি কাজ করা যেতে পারে, কার্পণ্য না করে তা করবে। কর্তব্য-অকর্তব্য, ধর্ম-অধর্ম ব্যাপারে মনে সংশয় জাগলে, বা দেখা দিলে, পিতা-পিতামহ বা সাধুজনেরা যে পথ অবলম্বন করে গেছেন, সেই পথই সৎপথ জেনে অনুসরণ করবে, তাহলে আর কোনো পাপে লিপ্ত হতে হবে না। সব সময় যাতে ভালো দেখায়, প্রিয়দর্শন হয়, সেদিকে যত্ন নেবে। সর্বদা ঈশ্বর আরাধনা করবে, ঈশ্বর চিন্তা করবে।

গৃহস্থাশ্রমে থেকে যে বিষয়ের প্রতি আসক্তি, ক্রোধ, লোভ, ভয়, মোহ পরিত্যাগ করে সে- সংসার বন্ধন থেকে মুক্তি পায়। যে গৃহস্থ মনকে হিংসাশূন্য, ধীর, দান্ত (ইন্দ্রিয় দমন) রাখতে পারে সেই গৃহস্থই পরলোকে স্বর্গসুখ প্রাপ্ত হয়। যে সর্বদা মাতা, পিতা, গুরু ব্রাহ্মণের হিতসাধনে রত এবং দেবতার প্রতি ভক্তি, দানব্রত যজ্ঞপরায়ণ, সে- ব্রহ্মলোকে সম্মান পায়। ধর্ম, অর্থ, কামগৃহস্থ সর্বদাই এই ত্রিবর্গের সাধনা করবে আর প্রত্যহ বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে দেবতা প্রণাম পূজা করবে। গৃহী সর্বদাই সংযত হয়ে ধর্ম, অর্থ কামে নিজেকে নিযুক্ত রাখবে। যার মধ্যে ধর্ম নেই, এমন অর্থ বা কাম মনেও চিন্তা করবে না। ধর্মকর্ম করতে করতে অবসন্ন হলেও, কখনো অধর্ম আচরণ করবে না। কারণ ধর্মই হল দেবরূপী ভগবান এবং প্রাণী মাত্রেরই গতি। যা সর্বভূতের অর্থাৎ সবার প্রিয়, তেমন কর্ম করবে; পরদ্রোহিতার বুদ্ধি কখনো মনে আনবে না; বেদ বা দেবতার নিন্দা করবে না; নিন্দাকারীর সঙ্গে আলাপ করবে না।".....

— (কূর্মমহাপুরাণের উপরিভাগে ব্যাসগীতার ঋষ্যাদিসংবাদে ধর্মাধ্যায় যোগ)

শ্রীশুভ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি , ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

মনই হল যাবতীয় ভ্রান্তির মূল

 


"মনই হল যাবতীয় ভ্রান্তির মূল। মনের প্রতি বশ্যতাই ঘটায় যত বিভ্রম। তারই স্বভাব-বলে মানুষ এই দেহকেই ভেবে নেয় সবকিছু; দেহ- সব, জগতে দেহ ছাড়া দ্বিতীয় কিছু নেই (অর্থাৎ মানুষকে অহঙ্কারী করে) দেহবোধেই স্বজনের প্রতি জাগায় মমতা; জাগায় আপন-পর বোধ। এইভাবে মোহাবিষ্ট সেই মানুষকে অজ্ঞানের অন্ধকারে ফেলে, মনই তাকে সংসারে ঘুরপাক খাওয়ায়।"

-(ভিক্ষুগীতা-৫০)

অসন্তোষই দুঃখের কারণ

 


"অসন্তোষই দুঃখের কারণ। লোভ ইন্দ্রিয় এবং মনকে এমনভাবে চঞ্চল করে রাখে যে ভাল-মন্দ বিচার করার সামর্থ্য মানুষ হারিয়ে ফেলে। সে তখন তার প্রজ্ঞা বা বুদ্ধি নষ্ট করে ফেলে, যেমনভাবে অভ্যাস বা চর্চা না করার ফলে বিদ্যা নষ্ট হয়ে যায়। প্রজ্ঞা (জ্ঞানবুদ্ধি) নাশ হলে বিশ্লেষণ ক্ষমতা হারিয়ে ন্যায়কে, সত্যকে অর্থাৎ আত্মোন্নতির সঠিক পথকে সে আর দেখতে পায় না। ফলে, তার কাছে দুঃখ অনিবার্য হয়ে আসে। দুঃখ এলে, সুখের ক্ষয় হলে প্রত্যেকেরই কর্তব্য ঘোর তপস্যা করা।"

-(পরাশর গীতা, ষষ্ঠ অধ্যায়-২৫, ২৬)

সাধুদের লক্ষণ কি?

 


তিতিক্ষবঃ কারুণিকাঃ সুহৃদঃ সর্বদেহিনাম্। অজাতশত্রবঃ শান্তাঃ সাধবঃ সাধুভূষণাঃ।

-(শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ, তৃতীয় স্কন্ধ, পঞ্চবিংশ অধ্যায়,২১)

অর্থাৎ সাধুগণ সহনশীল, পরম কারুণিক (দয়ালু), শমগুণাদিসম্পন্ন, অজাতশত্রু (যাঁদের কোন শত্রু নাই), সকল প্রাণীর সুহৃদ, শাস্ত্রানুবর্তী সচ্চরিত্র-ভূষিত (সুশীল অর্থাৎ শোভন স্বভাব যাঁদের ভূষণ)...

শ্রীশুভ চৌধুরী

মে , ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

জ্ঞানহীন মানুষ ইন্দ্রিয় পরতন্ত্র হয়ে পশুরই সমান হয়।

 


শ্রীভগবান্ বলছেন —"আহার, নিদ্রা, ভয়, মৈথুনএই চারটি সামান্য ধর্ম যেমন আছে মানুষের মধ্যে তেমনি আছে পশুতে। এতটুকু তফাৎ নেই। এর বাইরে মানুষের বিশেষ ধর্ম হল জ্ঞান। জ্ঞানহীন মানুষ ইন্দ্রিয় পরতন্ত্র হয়ে পশুরই সমান হয়। সকালে উঠে মল-মূত্র ত্যাগ করে, দুপুরে ক্ষুধায় কাতর হলে তৃপ্তির সঙ্গে আহার করে, রাতে বিহার শেষে নিদ্রা যায়, পশুদেরও সেই একই কাজকোন তফাৎ নেই। তফাৎ তখনই আসে যখন মানুষের মনে তত্ত্বজ্ঞানের (অর্থাৎ 'আমিই ব্রহ্ম' এই অদ্বৈতজ্ঞানের) উদয় হয়। হাজার হাজার নাদবিন্দু, কোটি কোটি জীব ভস্মীভূত হয়ে অহরহ নিরঞ্জনে লয় পাচ্ছে। 'আমি ব্রহ্ম' এই জ্ঞান যার না হয়েছে, তার মুক্তি নেই।"

-(উত্তর গীতা, দ্বিতীয় অধ্যায়, ৪৪-৪৭)

শ্রীশুভ চৌধুরী

জুন , ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

ভাগবতে অদ্বৈতবেদান্তোক্ত দৃগ্-দৃশ্যবিবেক ও প্রতিবিম্ববাদ—

  সনৎকুমার মোক্ষের সাধন উপদেশ করতে গিয়ে বলছেন — দগ্ধাশয়ো মুক্তসমস্ততদ্গুণো নৈবাত্মনো বহিরন্তর্বিচষ্টে । পরাত্মনোর্যদ্ব্যবধানং...