Friday, 23 December 2022

ভগবতী শ্রীরাধা ও রাসলীলার আধ্যাত্মিকভাব—

 


বিষ্ণুপুরাণোক্ত "হ্লাদিনী, সন্ধিনী ও সম্বিৎ এই তিন শক্তি ভগবানকে আশ্রয় করিয়া আছেন। তন্মধ্যে হ্লাদিনী প্ৰেম স্বরূপা ; ইনিই রাধা নামে কীৰ্ত্তিতা। যিনি শ্ৰীকৃষ্ণের মন হরণ করেন, তিনিই হরা; কৃষ্ণাহ্লাদস্বরূপিণী রাধাই এই নামে অভিহিত হইয়া থাকেন।

রাধ্ ধাতু হইতে রাধাশব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে। রাধ্ ধাতুর অর্থ সাধনা, পূজা বা তুষ্টকরা। যিনি সাধন করেন, পূজা করেন বা তোষণ করেন,—তিনিই রাধা। আর এই শক্তিকে যিনি আকর্ষণ করেন,—তাঁহার নাম কৃষ্ণ। কৃষ্ ধাতু হইতে কৃষ্ণ শব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে, কৃষ্ ধাতুর অর্থ আকর্ষণ করা ; যিনি সাধনাকারিণী শক্তির সৰ্বেন্দ্ৰিয় আকর্ষণ করেন, তাঁহাকেই কৃষ্ণ বলে। অতএব রাধা ও কৃষ্ণ একই আত্মা। তাঁহারা অগ্নি ও দাহিকাশক্তির ন্যায় ভেদাভেদরূপে নিত্য বৰ্ত্তমান থাকিয়া সমগ্ৰ প্ৰাপঞ্চিক জীব সমূহের অন্তর্বাহ্যে বিরাজ করিতেছেন। তাই শ্ৰীকৃষ্ণ গোপীদিগকে বলিয়াছিলেন

অহং হি সর্বভূতানামাদিরন্তোহন্তরং বহিঃ।

ভৌতিকানাং যথা খং বা ভূর্বায়ুর্জ্যোতি রঙ্গনাঃ৷

-(শ্রীমদ্ভাগবত, ১০ম স্কন্ধ, ৮২ অধ্যায়, ৪৫)

"যেরূপ আকাশ, বায়ু, তেজ, জল ও ক্ষিতি এই পঞ্চমহাভূত, সমুদায় ভৌতিক পদার্থের কারণ ও কাৰ্য্য হইয়া, তাহাদিগের অন্তর্বহিঃ বৰ্ত্তমান রহিয়াছে; তদ্রুপ আমিই একমাত্র সর্বপ্রাণীর কারণ ও কাৰ্য্য বলিয়া, সকলেরই অন্তৰ্ব্বাহ্যে বিরাজ করিতেছি ; সুতরাং আমার সহিত তোমাদিগের বিচ্ছেদ, কদাপি সম্ভবপর নহে।

রাধা আর কৃষ্ণ একই আত্মা; জীবকে প্ৰেমতত্ত্ব আস্বাদন করাইতে ও তৎসাধনা শিক্ষা দিতে ব্রজধামে উভয়দেহ ধারণ করিয়াছিলেন। সেই ব্ৰজলীলা বুঝিতে হইলে সৰ্ব্বাগ্রে ব্রজলীলার আধ্যাত্মিক ভাব হৃদয়ঙ্গম করা কৰ্ত্তব্য ; তাহা হইলে প্ৰাকৃতলীলা সহজেই বোধগম্য হইবে। জীবের সহিত ভগবানের যে ঘনিষ্ট সম্বন্ধ, সে সম্বন্ধ কেবল প্ৰাকৃত স্ত্রীপুরুষের সম্বন্ধ ব্যতীত আর কিছুরই অনুরূপ হইতে পারে না। এজন্য যোগের সেই ঘনিষ্ট সম্বন্ধ হিন্দুঋষি ব্ৰজলীলায় রাধাকৃষ্ণ তত্ত্বে প্ৰকাশ করিয়াছেন। আত্মা যখন সংসারের কুটিলতা ও মায়া হইতে পরিব্রাজিত হয়েন, তখন তাঁহার ব্রজ ভাব ঘটে। তৃণাবৰ্ত্ত, অঘাসুর, বকাসুররূপী হিংসা-কুটিলতা নাশ করিতে না পারিলে ব্ৰজভাব প্ৰাপ্তি হয় না। সেই ব্ৰজভাবে প্ৰকৃতি ব্ৰজেশ্বরী। ব্ৰজেশ্বরীর মিলন আনন্দধাম বৃন্দাবনে। যতদিন না জীবের সংসার বীজ সমুদায় নষ্ট হয়, ততদিন তাহার মুক্তি নাই। সাঙ্খ্য মতে প্ৰকৃতি-পুরুষের ঘনিষ্টতাই জগৎ-সংসার। জগতেই প্ৰকৃতিপুরুষ ঘোর আসক্ত; তাহাদের বিচ্ছেদই মুক্তির সোপান। রাধার শতবৎসর বিচ্ছেদে জীবাত্মার শতবৎসর অনাসক্তিতে মুক্তিলাভ। শতবৎসর পর রাধিকার সহিত কৃষ্ণের মিলন। মিলনে জীবাত্মার মোক্ষপদ। যোগের এই সমস্ত নিগূঢ়তত্ত্ব এক একটী করিয়া, হিন্দু অবয়বী কল্পনায় মূৰ্ত্তিমান করিয়া দেখাইয়াছেন। যোগে জীবাত্মা পরমাত্মতত্ত্বের সহিত যতভাবে রমণ করেন, তাহার অনুভব ও মিলনের যত প্রকার স্তর আছে, তৎসমুদায় কৃষ্ণলীলায় প্রকটিত।

দ্বাপর যুগের শেষ সন্ধ্যায় যখন জীব কৰ্ম্ম ও জ্ঞানের কর্কশ সাধনায় জ্বলিত-কণ্ঠে ভগবানের কৃপাবারির আশায় উৰ্দ্ধমুখে চাহিয়াছিল, বাসনা-বিদগ্ধ হইয়া আনন্দের অনুসন্ধানে ঘুরিতেছিল, ভগবান সেই সময় মনুষ্যের উৰ্দ্ধগতি দানজন্য-পরমানন্দ দানজন্য-পিপাসিতকণ্ঠে মধুর প্ৰেমরসের পূর্ণধারা ঢালিয়া দিবার জন্য হ্লাদিনীশক্তির সহিত রাধাকৃষ্ণরূপে ব্রজধামে অবতীর্ণ হইয়া ছিলেন। জগতের প্রধান ভাব প্ৰেম, সেই প্ৰেমদান করিতে, প্ৰেমশিক্ষা প্ৰদান করিতে, প্ৰেমে জগৎকে জাগাইতে ভগবান্ আপনার হ্লাদিনী শক্তির সহিত বৃন্দাবনে মাধুৰ্য্যের রাসলীলা করিয়াছিলেন। কৃষ্ণ অবতারের উদ্দেশ্যই অপূর্ণ মানবকে প্রেমের আস্বাদন দিয়া, ভগবানের ক্ষরিত প্ৰেমসুধা পান করাইয়া নিবৃত্তির পথে লইয়া যাওয়া। আদর্শ ব্যতীত মানব এক পদও অগ্রসর হইতে পারে না; অপূর্ণ জীব কি কখন পূর্ণানন্দ প্রতিষ্ঠা করিতে পারে?

জীবকে এই আদর্শ দেখাইয়া প্ৰেমভক্তির পথে পূর্ণানন্দ প্ৰদানের জন্যই ব্রজলীলা-ভগবানের “রাধাকৃষ্ণ অবতার। অতএব ব্রজলীলা বা রাধাকৃষ্ণের রতিরস কদৰ্য্য বা ঘূণ্য নহে। ভগবান্ স্ব-স্বরূপেই রমমাণ; তাই তাঁহার নাম আত্মারাম ঈশ্বর। সেই রমণীলীলায় ব্রজলীলা। জীব আর শক্তি লইয়া তাঁহার সকল। জীব আর শক্তি না থাকিলে  তিনি নির্গুণ, নিক্ৰিয়। জীব যখন সাধন বলে নিষ্কামভাবে প্ৰকৃতির বাহুবন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া ভগবানকে আত্মসমর্পণ করে-তখন ভগবানের স্বরূপশক্তি প্রাপ্ত হয়। কিন্তু জীব তখন নিষ্কাম-সে শক্তি লইয়া কি করিবে? তাহার কামনা গিয়াছে, কর্ম গিয়াছে, শক্তির তাহার প্রয়োজন কি? তাই জীব সে শক্তি তাঁহাকেই প্রত্যার্পণ করে। সে শক্তি নিজশক্তি বলিয়া-আনন্দময়ী হ্লাদিনীশক্তি বলিয়া, ভগবান তাহা গ্ৰহণ করিয়া মধুরভাবে আলিঙ্গন করতঃ মিলিত হয়েন। ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য শ্রীজগন্নাথাষ্টকম্ শীর্ষক স্তোত্রে বলিতেছেন"রসানন্দো রাধাসরসবপুরালিঙ্গনসুখো জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে" অর্থাৎ "শ্ৰীরাধিকার রসময় দেহ আলিঙ্গনে সুখী, সেই প্ৰভু জগন্নাথ আমার নয়নপথগামী হউন।"

এইরূপ ভগবান ও ভক্তের স্বরূপগত অভেদাত্মক মিলনের নাম রমণ; যোগীর ইহাই সমাধি। মহাভারতের বিষ্ণুসহস্রনামের ভাষ্যে শঙ্করাচার্য বলিতেছেন "নিত্য আনন্দ স্বরূপ ভগবানের সহিত যোগীজন রমন করেন, সেজন্যই তিনি (বিষ্ণু) রাম। পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে- যে নিত্যানন্দ স্বরূপ চিদাত্মায় যোগীজন রমন করেন সেই পরম ব্রহ্মকে 'রাম' এই নামে বলা হয়ে থাকে।" ভগবান্ ভক্তের সহিত রমণ করিবেন, ভক্তও ভগবানের সহিত রমণ করিবেন। এ রমণ বা মিলন পরস্পরের ইচ্ছায় নহে, স্বাভাবিক। ভগবান এই প্রকারে যে নিজশক্তি বা প্রকৃতির সহিত রমণ করেন, এ রমণ মায়িক জগতের কেহ জানিতে পারে না, —ইহাই ব্রজের অমানুষী গূঢ়লীলা। এই স্বরূপশক্তির শীর্ষ স্থানীয়া হ্লাদিনীশক্তি, সেই আনন্দদায়িনী হ্লাদিনী ভগবানকে আনন্দাস্বাদন করাইয়া থাকেন। হ্লাদিনী শক্তি দ্বারা ভক্তের পোষণ হয়, তজ্জন্য তাঁহার অপর নাম গোপী। শ্ৰীমতী রাধাই গোপীকুলশিরোমণি, তাই রাধার প্রেমও সাধ্যের শিরোমণি। নিরবচ্ছিন্ন আনন্দদায়িনী হ্লাদিনীশক্তি রাধার সহিত, পরমপুরূষ শ্ৰীকৃষ্ণের যে মিলন, তাহাই রমণ বা রাসক্রীড়া নামে অভিহিত। তাই গোপীভাবের সাধনায় শৃঙ্গার রসকে মধ্যগত করতঃ প্রেমিক-প্রেমিকা উভয়ের চিত্ত দ্রবীভূত হইয়া সম্ভোগ-মিলন সংঘটিত হয়, তাহাতে সমস্ত প্রকার ভেদ-ভ্ৰম দুৱীভূত হইয়া যায়। রাসক্রীড়ায় সর্বপ্রকার চিত্তরঞ্জনের দ্বারা গোপীগণের ভক্তি উদ্রিক্তা হইলে, তাহারা কৃষ্ণানুরাগিণী হইয়া আপনাদিগকেই কৃষ্ণ বলিয়া জানিতে লাগিল, কৃষ্ণের কথিতব্য কথা কহিতে লাগিল, এবং কেবল জগদীশ্বরের সৌন্দর্যের অনুরাগিণী হইয়া জীবাত্মা পরমাত্মায় যে অভেদ জ্ঞান, যাহা যোগীর যোগের এবং জ্ঞানীর জ্ঞানের চরমোদ্দেশ্য, তাহা প্রাপ্ত হইয়া ঈশ্বরে বিলীন হইল। বিষ্ণুপুরাণে বর্ণিত আছে এই অভেদ তত্ত্ব। যথা-

"ভগবান কৃষ্ণ অন্যত্র চলিয়া গেলে গোপীগণ কৃষ্ণচেষ্টার অনুকারিণী হইয়া দলে দলে বৃন্দাবনমধ্যে ফিরিয়া বেড়াইতে লাগিল; এবং কৃষ্ণে নিরুদ্ধহৃদয়া হইয়া পরস্পরকে এইরূপ বলিতে লাগিল, ‘আমি কৃষ্ণ, এই ললিতগতিতে গমন করিতেছি, তোমরা আমার গমন অবলোকন কর। অন্যা বলিল, ‘আমি কৃষ্ণ, আমার গান শ্রবণ কর। অপরা বলিল ‘দুষ্ট কালিয়! এইখানে থাক, আমি কৃষ্ণ,’ এবং বাহু আস্ফোটন-পূর্বক কৃষ্ণলীলার অনুকরণ করিল। আর কেহ বলিল, ‘হে গোপগণ! তোমরা নির্ভয়ে এইখানে থাক, বৃথা বৃষ্টির ভয় করিও না, আমি এইখানে গোবর্ধন ধরিয়া আছি। অন্যা কৃষ্ণলীলানুকারিণী গোপী বলিল, ‘এই ধেনুককে আমি নিক্ষিপ্ত করিয়াছি, তোমরা যদৃচ্ছাক্রমে বিচরণ কর। এইরূপে সেই সকল গোপী তৎকালে নানাপ্রকার কৃষ্ণচেষ্টানুবর্তিনী হইয়া ব্যগ্রভাবে রম্য বৃন্দাবন বনে সঞ্চরণ করিতে লাগিল।" -(বিষ্ণুপুরাণ, পঞ্চমাংশ, ত্রয়োদশ অধ্যায়, ২৪-২৯)

রাধাকৃষ্ণই রসতত্ত্ব। যিনি বাক্য ও মনের অগোচর, তিনি ব্ৰহ্ম ; ব্ৰহ্মই আনন্দামৃতরূপ রস। শ্রুতি বলেছেন "রসো বৈ সঃ" (তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২/৭) অর্থাৎ ব্রহ্মই রসস্বরূপ। এই রস আস্বাদনার্থই ভগবানের সৃষ্টিকাৰ্য্য; জীব সেই বাসনাবিদগ্ধ হইয়া, রসের পিপাসু হইয়া, ঘুরিয়া মরিতেছে। গোপীভাবের সাধনায় সেই রস-রতির  জ্ঞান হয়, হৃদয়ে তাহা প্রকাশ পায়। ভগবানের যে রসপ্রাপ্তিকামনা, সেই রস পূর্ণভাবে রাধায় বিরাজিত। সুতরাং রসের বিকাশ রাধাতত্ত্বে। রাধার সহিত শ্ৰীকৃষ্ণের যে ব্রজলীলা তাহাই রসের আশ্রয় বা রস-সাধনা৷ রাধা আর কৃষ্ণ একই আত্মা ; জীবকে রসতত্ত্ব আস্বাদন করাইতে ব্রজধামে উভয় দেহ ধারণ করিয়াছিলেন। সেই রাধাকৃষ্ণ আত্মস্বরূপে অর্থাৎ আত্মারূপে প্ৰতি জীবহৃদয়ে অধিষ্ঠিত আছেন।......

তথ্যসূত্রঃ-

১. ভগবান শঙ্করাচার্যের "বিষ্ণুসহস্রনাম" ভাষ্য।

২. স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতীর "প্রেমিকগুরু" শীর্ষক গ্রন্থ।

...............................................................

শ্রীশুভ চৌধুরী

ডিসেম্বর ১৬, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ।

বিষয়ই প্রকৃত বিষপদবাচ্যঃ-


 

'সন্তোষরূপ অমৃত পান করিয়া যে শান্তচিত্ত পুরুষ তৃপ্তিলাভ করিয়াছেন, তিনি অতুল ভোগৈশ্বর্যকে বিষবৎ মনে করিয়া থাকেন।'-(#যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ,মুমুক্ষু প্রকরণ,১৫।৪)

'বিষয়ই প্রকৃত বিষপদবাচ্য। লৌকিক যে বিষ, তাহা প্রকৃত বিষ নহে। যেহেতু লৌকিক বিষ এই জন্মে শুধু এই শরীরকে বিনষ্ট করে; আর বিষয়রূপ বিষ জন্ম-জন্মান্তর ব্যাপিয়া মানুষকে মরণের পথে লইয়া যায়।'-(যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ,বৈরাগ্য প্রকরণ,২৯।১৩)...............................

শ্রীশুভ চৌধুরী

ডিসেম্বর ২১, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ।

Saturday, 19 November 2022

তৈত্তিরীয়োপনিষদে আচার্য্য কর্তৃক শিষ্যকে গার্হস্থ্য আশ্রমে প্রবেশের পূর্বে অনুশাসনঃ-

 


কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় শাখার অন্তর্গত তৈত্তিরীয়োপনিষদের শিক্ষাবল্লীর একাদশ অনুবাকে বর্ণিত আছে-

বেদমনূচ্যাচার্যো অন্তেবাসিনমনুশাস্তি। সত্যং বদ।ধর্মং চর।স্বাধ্যায়ান্মা প্রমদঃ।আচার্যায় প্রিয়ং ধনমাহৃত্য প্রজাতন্তুং মা ব্যবচ্ছেৎসীঃ।সত্যান্ন প্রমদিতব্যম্।ধর্মান্ন প্রমদিতব্যম্।কুশলান্ন প্রমদিতব্যম্। ভূত্যৈ ন প্রমদিতব্যম্।স্বাধ্যায়প্রবচনাভ্যাং ন প্রমদিতব্যম্।।১।।

-স্বাধ্যায়ের জন্য নির্বাচিত অংশরূপ বেদপাঠ করাইয়া আচার্য্য শিষ্যকে অনুশাসন করিতেছেন-' সত্য বচন বলিও অর্থাৎ প্রমাণানুযায়ী জ্ঞাত ও কথনযোগ্য বিষয় বলিও। ধর্ম্ম আচরণ করিও, আর ধর্ম্ম এই শব্দ অনুষ্ঠেয় সকল কর্ম্মেরই সূচক। আর স্বাধ্যায়ে অর্থাৎ অধ্যয়নে অমনোযোগী হইও না। আচার্য্যের জন্য প্রীতিকর ধন আনিয়া অর্থাৎ বিদ্যার দক্ষিণা ধন দিয়া, আচার্য্যের অনুমতি লইয়া যোগ্যপত্নী গ্রহণপূর্বক অপত্যবংশের বিচ্ছেদ করিও না, অর্থাৎ পুত্র না জন্মিলেও পুত্রকাম্য পুত্রেষ্টি প্রভৃতি যজ্ঞকর্ম্মের দ্বারা পুত্রোৎপত্তিতে যত্ন করণীয়। সত্য হইতে বিচ্যুত হইও না, অর্থাৎ প্রমাদ শব্দের সঙ্গতার্থতাবশতঃ ভুলক্রমেও মিথ্যা বলিবে না। ধর্ম্মানুষ্ঠান করিতে হইবে, ধর্ম্ম শব্দ অনুষ্ঠেয় পৃথক পৃথক কর্ম্ম বিষয়ক বলিয়া তাহাদের অনুষ্ঠান না করাই প্রমাদ, সেই প্রমাদ করা উচিত নহে। এইরূপ স্বীয় কুশলে অর্থাৎ আত্মরক্ষা বিষয়ক কর্ম্মে অমনোযোগী হইবে না। ভূতি অর্থ সমৃদ্ধি, সেই সমৃদ্ধির নিমিত্ত ভূতি বিষয়ক মঙ্গলযুক্ত কর্ম্মে অমনোযোগী হইবে না। অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা থেকে কখনো বিচ্যুত হইবে না, অর্থাৎ পঠনপাঠন উভয়ই নিয়মপূর্বক করিবে।'১

শ্রুতিতে মাতা, পিতা, আচার্য্য ও অতিথি দেবতার ন্যায় আরাধ্যঃ-

 


কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় শাখার অন্তর্গত তৈত্তিরীয়োপনিষদের শিক্ষাবল্লীর একাদশ অনুবাকে বর্ণিত আছে-

দেবপিতৃকার্যাভ্যাং ন প্রমদিতব্যম্। মাতৃদেবো ভব। পিতৃদেবো ভব। আচার্যদেবো ভব। অতিথিদেবো ভব। যান্যনবদ্যানি কর্মাণি তানি সেবিতব্যানি। নো ইতরাণি। য়ান্যস্মাকং সুচরিতানি। তানি ত্বয়োপাস্যানি।নো ইতরাণি।।২

আর সেইরূপ যজ্ঞাদি দেবকার্য্য ও শ্রাদ্ধতর্পানাদি পিতৃকার্য্যে অমনোযোগী হইবে না অর্থাৎ দেবকার্য্য ও পিতৃকার্য্য কর্ত্তব্য। আর মাতা, পিতা, আচার্য্য ও অতিথি ইঁহারা দেবতার ন্যায় আরাধ্য। এতদ্ভিন্ন অন্য অনিন্দিত অর্থাৎ শিষ্টাচার সম্পন্ন কর্ম্ম আছে সেইসকল তুমি করিবে। আর অপর নিন্দিত যেসকল কর্ম্ম আছে, সেইসকল কর্ম্ম শিষ্টজন করিলেও তুমি করিবে না। আমাদের অর্থাৎ আচার্য্যদের সুচরিত অর্থাৎ যেসকল বেদাদি সম্মত সদাচার আছে, পুণ্যের জন্য সেই সকল কর্ম্মই তুমি নিয়মপূর্বক অনুষ্ঠান করিবে। অপর আচরণ সকল যাহা সদাচারের বিপরীত তাহা আচার্য্যগণ কর্তৃক কৃত হইলেও তুমি করিবে না।২।

পুরাণাদি শাস্ত্রে পিতা মাতার বন্দনাঃ-

 


ভগবান শ্রীগণেশের নিকট পিতামাতা ছিলেন পূজ্য, পৃথিবী ও তীর্থস্বরূপ। শ্রীশিবপুরাণের জ্ঞানসংহিতার পঞ্চত্রিংশ ও ষটত্রিংশ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে- শ্রীগণেশ যথাবিধ স্নানাদি পূর্বক নিজ পিতামাতাকে কহিলেন-'হে পিতা,হে মাতা, আপনাদিগের পূজার্থ এই আসনদ্বয় স্থাপিত করিয়াছি'। তৎশ্রবণে জগদম্বা পার্ব্বতী ও পরমেশ্বর পূজাগ্রহণার্থে আসনে উপবেশন করিলেন। গণেশ তাঁহাদিগকে পূজা করিয়া প্রেমপূর্ণ হৃদয়ে পিতামাতাকে সপ্তবার প্রদক্ষিণ করিলেন।

শ্রীগণেশ তৎপরে কৃতাঞ্জলীপুটে কহিতে লাগিলেন-হে মাতঃ, হে পিতঃ, আপনারা শ্রবণ করুন, আমি ভ্রাতা কার্ত্তিকের পূর্ব্বেই সপ্তবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করিলাম। অতএব শীঘ্রই আমার শুভবিবাহ দিন। তখন উঁহার কহিলেন- হে পুত্র, এই অরণ্যসঙ্কুলা পৃথিবীকে তুমি কখন প্রদক্ষিণ করিলে? উহা শ্রবণে গণেশ উত্তর করিলেন- আমি যে আপনাদের পূজা করিয়া সপ্তবার প্রদক্ষিণ করিলাম, উহা কি পৃথিবী প্রদক্ষিণ নহে? ধর্ম্মপ্রবর্ত্তক বেদশাস্ত্রে ঐরূপ কথায় আছে, তবে উহা কি সত্য নহে?-'যে ব্যক্তি পিতামাতার পূজা করিয়া প্রদক্ষিণ করে তাহার পৃথিবী প্রদক্ষিণরূপ ফল হয়, ইহাতে সংশয় নাই।পিতামাতার পাদপদ্মই পুত্রের প্রধানতীর্থ, দূরে যাইলে অন্যান্য তীর্থ পাওয়া যায়, কিন্তু এই তীর্থ সমীপস্থিত, সুলভ ও ধর্ম্মের সাধন।'-বেদাদি শাস্ত্র ইহাই বলে।

গণেশবাক্য শ্রবণে হরপার্ব্বতী বিস্মিত হইলেন। অনন্তর শিব ও পার্ব্বতী গণেশকে কহিলেন- 'বৎস, তুমি যথার্থই কহিয়াছ, তুমি মহাত্মা, তোমার বুদ্ধি নির্ম্মল, বেদাদি শাস্ত্রে যাহা কথিত আছে তাহাই তুমি করিয়াছ, পিতামাতা প্রদক্ষিণ করিলে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা হয়।'

যোগদর্শন শাস্ত্রে ওঙ্কার মাহাত্ম্যঃ-


 

পাতঞ্জল যোগসূত্রের সমাধিপাদে বর্ণিত আছে-

তস্য বাচকঃ প্রণবঃ ।।২৭।।

-প্রণব অর্থাৎ ওঙ্কার তাঁহার প্রকাশক শব্দ।

ব্যাসভাষ্যানুবাদঃ-ঈশ্বর প্রণবের বাচ্য বা বোধ্য।এই বাচ্যবাচকত্ব সম্বন্ধ কি সংকেত কৃত অথবা প্রদীপের প্রকাশের ন্যায় অবস্থিতি? এভাবে বাচ্যের ঈশ্বরের বাচকের তথা প্রণবের সঙ্গে সম্বন্ধ রয়েছে। ঈশ্বরের সংকেত কিন্তু এই শব্দে থাকা অর্থকেই প্রকাশ করে। যেমন পিতা পুত্রের সম্বন্ধ সংকেত দ্বারা, এদের শব্দ ও শব্দগত অর্থ দ্বারা প্রকাশ পায়। যেমন ইনি এঁর পিতা, ইনি এঁর পুত্র,সেভাবে। অন্যান্য উৎপন্ন বস্তুগুলিতেও এই বাচ্য-বাচক শক্তি সাপেক্ষ সম্বন্ধ রয়েছে। সদৃশ ব্যবহার পরম্পরায় নিত্যত্বহেতু শব্দার্থের সম্বন্ধও নিত্য, একথা শাস্ত্রবিদরা বলে থাকেন।

স্বামী বিবেকানন্দের ব্যাখ্যাঃ-সূত্রকার বলিতেছেন, ‘ওঙ্কার ঈশ্বরের বাচক। কেন তিনি এই শব্দটির উপর জোর দিলেন? ‘ঈশ্বর ভাবটি বুঝাইবার জন্য তো শত শত শব্দ রহিয়াছে। একটি ভাবের সহিত সহস্র সহস্র শব্দের সম্বন্ধ থাকে। ঈশ্বর-ভাবটি শত শত শব্দের সহিত সম্বন্ধ রহিয়াছে, উহার প্রত্যকটিই তো ঈশ্বরের বাচক। বেশ কথা, কিন্তু তাহা হইলেও ঐ শব্দগুলির মধ্যে একটি সাধারণ শব্দ বাহির করা চাই। ঐ বাচকগুলির একটি সাধারণ অধিষ্ঠান-সাধারণ শব্দ-ভূমি বাহির করিতে হইবে, আর যে বাচক শব্দটি সাধারণ বাচক হইবে, সেই শব্দটিই সর্বশেষ্ঠ বলিয়া পরিগণিত হইবে, আর সেইটিই সকলের প্রতিনিধিরূপে উহার যথার্থ বাচক হইবে। কোন শব্দ উচ্চারণ করিতে হইলে আমরা কন্ঠনালী ও তালুকে শব্দোচ্চারণের আধাররূপে ব্যাবহার করিয়া থাকি। এমন কি কোন শব্দ আছে, অপর সমুদয় শব্দ যাহার প্রকাশ, যাহা সর্বাপেক্ষা স্বাভাবিক শব্দ?-‘ওঁ (অউম্) এই প্রকার শব্দ; উহাই সমুদয় শব্দের ভিত্তি-স্বরূপ। উহার প্রথম অক্ষর ‘অ সমুদয় শব্দের মূল-উহাই সমুদয় শব্দের কুঞ্চিকাস্বরূপ, উহা জিহ্বা অথবা তালুর কোন অংশ স্পর্শ না করিয়াই উচ্চারিত হয়। ‘ম-বর্গীয় শব্দের শেষ শব্দ, উহার উচ্চারণ করিতে হইলে ওষ্ঠদ্বয় বন্ধ করিতে হয়। আর ‘উ এই শব্দ জিহ্বামূল হইতে মুখ-মধ্যবর্তী শব্দাধারের শেষ সীমা পর্যন্ত যেন গড়াইয়া যাইতেছে। এইরূপে ‘ওঁ শব্দটি দ্বারা সমুদয় শব্দোচ্চারণ-ব্যাপারটি প্রকাশিত হইতেছে। এই কারণে উহাই স্বাভাবিক বাচক শব্দ-উহাই ভিন্ন ভিন্ন শব্দের জননী-স্বরূপ। যত প্রকার শব্দ উচ্চারিত হইতে পারে-আমাদের ক্ষমতায় যত প্রকার শব্দ-উচ্চারণের সম্ভাবনা আছে, উহা সেই সকলেরই সূচক।

যোগবিঘ্নগুলি কি কি?

 


যোগসূত্রকার ভগবান পতঞ্জলি যোগান্তরায় গুলি বলিতেছেন-

ব্যাধিস্ত্যানসংশয়প্রমাদালস্যাবিরতিভ্রান্তিদর্শনালব্ধ-

ভূমিকাত্বানবস্থিতত্বানি চিত্তবিক্ষেপাস্তেহন্তরায়াঃ ।। (পাতঞ্জল যোগসূত্র-১/৩০)

'ব্যাসভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থরোগব্যাধি, চিত্তের অকর্মণ্যতা অর্থাৎ মানসিক জড়তা, সংশয়, প্রমাদ (উদ্যমরাহিত্য) অর্থাৎ সমাধির সাধনের অননুষ্ঠান, আলস্য, অবিরতি বা বিষয়তৃষ্ণা, ভ্রান্তিদর্শন অর্থাৎ বিপর্যয়জ্ঞান, একাগ্রতা লাভ না করা, ঐ অবস্থা লাভ হইলেও তাহা হইতে পতিত হওয়া-এইগুলিই চিত্তবিক্ষেপকর অন্তরায়।

সন্তোষই পরম সুখঃ-

 


পাতঞ্জল যোগদর্শনের সাধনপাদে সূত্রকার বলছেন-সন্তোষাদনুত্তমঃ সুখলাভঃ ।।৪২।।-সন্তোষ হইতে পরম সুখলাভ হয়।

ব্যাস ভাষ্যানুবাদঃ-(বিষ্ণুপুরাণে) এভাবে বলা হয়েছে, এ সংসারে কামনাজনিত যে সুখ, আর দিব্য স্বর্গীয় যে মহান সুখ, এগুলি তৃষ্ণাক্ষয় জনিত সুখের ষোলভাগেরও এক ভাগ নয়।

ব্যাখ্যাঃ- অভাব বোধই দুঃখের কারণ, তাদৃশ বোধ না থাকিলে আত্মার পরিপূর্ণতা অনুভব হয়, ইহাকেই আত্মারাম বলে। মহাভারতে উক্ত আছে ; যযাতি রাজা বৃদ্ধাবস্থায়ও ভোগতৃষ্ণা দূর করিতে না পারিয়া নিজের পুত্র পুরুর যৌবন গ্রহণ করেন, কিছুকাল পুনৰ্ব্বার বিষয় ভোগ করিয়াও যখন দেখিলেন ভোগতৃষ্ণা যাইবার নহে, বরং ক্রমশঃ বৃদ্ধি হইতেছে, তখন পুত্রের যৌবন প্রত্যর্পণ করিয়া বলিলেন পামরগণ যে তৃষ্ণাকে ত্যাগ করিতে পারে না, বৃদ্ধ হইলেও যাহা ক্ষীণ হয় না, পণ্ডিতগণ সেই তৃষ্ণাকে পরিত্যাগ করিয়া সুখে কাল অতিবাহিত করেন।

মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রঃ-

 


ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্: উর্বারুকমিব বন্ধনান্মৃত্যোর্মুক্ষীয় মামৃতাত্।-(ঋগ্বেদ সংহিতা ।। ৭ম মণ্ডল।। সূক্ত ০৫৯।। ১২ ঋক্।। দেবতা -রুদ্র )

অর্থাৎ পরব্রহ্মবাচ্য প্রণব। সুগন্ধি পুষ্টিবৰ্দ্ধক ত্ৰ্যম্বক (ত্রিনেত্রধারী) রুদ্রের যজ্ঞ করি। উর্বারুক ফলের ন্যায় যেন আমরা মৃত্যুবন্ধন হইতে মুক্ত হই। আবার মোক্ষাখ্য অমৃত হইতে যেন না বঞ্চিত হই।

বিষ্ণু-স্মরণঃ-

 


তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সুরয়ঃ। দিবীব চক্ষুরাততম্‌।।-(ঋগ্বেদ সংহিতা,প্রথম মণ্ডল,২২ সুক্ত,২০ঋক্)

দুর্গাদাস লাহিড়ীর মর্ম্মানুসারী ব্যাখ্যাঃ- নিরাবরণ আকাশে সূর্য্যালোক-প্রাপ্তে চক্ষু যেমন অবাধে সমস্ত দর্শন করিতে সমর্থ হয়, জ্ঞানিগণ সেইরূপ পরাজ্ঞান প্রভাবে পরমৈশ্বর্য্যসম্পন্ন সর্ব্বব্যাপক ভগবত বিষ্ণুর পরমপদ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠস্বরূপতত্ত্ব সদাকাল প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন।

এই ঋক্ এর ভাব এই যে আকাশে সর্বতো বিচারী যে চক্ষু যেরূপ দৃষ্টি করে, বিদ্বানেরা বিষ্ণুর পরমপদ সেরুপ দৃষ্টি করেন। প্রার্থনার মর্মার্থ এই যে- হে ভগবান! আমার জ্ঞাননেত্র উন্মীলন করিয়া দাও, আমার সম্মুখের বাধা অপসারিত হউক, আকাশের ন্যায় নির্ম্মল পথে আমি যেন তোমায় সদাকাল সর্ব্বত্র দেখিতে পাই।

কি প্রকারে দান কর্তব্য?

 


দান প্রসঙ্গে কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় শাখার অন্তর্গত তৈত্তিরীয়োপনিষদের শিক্ষাবল্লীর একাদশ অনুবাকে বর্ণিত আছে-

'শ্রদ্ধয়া দেয়ম্। অশ্রদ্ধয়াদেয়ম্। শ্রিয়া দেয়ম্। হ্রিয়া দেয়ম্। ভিয়া দেয়ম্। সংবিদা দেয়ম্।।' ৩

ভাবার্থঃ- আচার্য্য কর্তৃক শিষ্যকে গার্হস্থ্য আশ্রমে প্রবেশের পূর্বে উপদেশ দিতেছেন-'যাহা কিছু দান করিবে, শ্রদ্ধার সহিতই করিবে। অশ্রদ্ধাসহকারে দান করিবে না। ঐশ্বর্যানুযায়ী অর্থাৎ সামর্থ্যানুসারে দান করিবে। সলজ্জভাবে অর্থাৎ নম্রতা সহকারে দান করিবে। সম্ভ্রমের সহিত অর্থাৎ দম্ভ না করিয়া দান করিবে। সংবিদা অর্থাৎ মিত্রতা স্থাপনের জন্য দান করিবে।'৩

ঋগ্বেদীয় পুরুষ-সূক্তের ১ম ঋক্ঃ-

 



পুরুষ দেবতা। নারায়ণ ঋষি।

সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ।

স ভূমিং বিশ্বতো বৃত্বাত্যতিষ্ঠদ্দশাঙ্গুলম্।।

-(ঋগ্বেদ সংহিতা, ১০ম মণ্ডল, সূক্ত- ৯০, ঋক্- ১)

ভাবার্থঃ- সেই পুরুষের (ভগবানের) সহস্রশীর্ষ (অনন্তমস্তকবিশিষ্ট অর্থাৎ অনন্তশক্তিশালী), সহস্ৰচক্ষু (অনন্তচক্ষুবিশিষ্ট অর্থাৎ অনন্তজ্ঞানস্বরূপ বা সর্বজ্ঞ) ও সহস্রচরণ (সর্ব্বত্র বিদ্যমান বা সর্ব্বব্যাপক)। তিনি ভূমিকে (পৃথিবী বা ব্রহ্মাণ্ডকে) সর্বত্র ব্যাপ্ত করিয়া দশ অঙ্গুলি পরিমাণ অতিরিক্ত হইয়া অবস্থিত থাকেন, অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডকে সর্ব্বতোভাবে সকল দিক হইতে বেষ্টন করিয়া অতিক্ষুদ্র হৃদ্দেশে অথবা ব্রহ্মাণ্ডের অতীত স্থান অতিক্রম করিয়া বিদ্যমান আছেন।।

এই মন্ত্রটী নিত্য সত্যতত্ত্ব প্রখ্যাপক। ভাব এই যে, সকল বিশ্ব ভগবানের একাংশে অবস্থিত; তিনি সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ।

ভক্তশ্রেষ্ট প্রহ্লাদের বিষ্ণুভক্তিতে তন্ময় হয়ে অভেদজ্ঞানে অদ্বৈতসিদ্ধিঃ-

 


বিষ্ণুমহাপুরাণের প্রথমাংশের উনবিংশ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-সেই মহামতি প্রহ্লাদ সমুদ্রমধ্যে পর্ব্বতাচ্ছাদিত থাকিয়া আহ্নিক বেলায় একাগ্র চিত্তে অচ্যুতের স্তব করিতে লাগিলেন।-

প্রহ্লাদ উবাচ।

নমস্তে পুন্ডরীকাক্ষ নমস্তে পুরুষোত্তম।

নমস্তে সর্ব্বলোকাত্মন্ নমস্তে তিগ্মচক্রিণে।৬৪

নমো ব্রহ্মণ্যদেবায় গোব্রাহ্মণহিতায় চ।

জগদ্ধিতায় কৃষ্ণায় গোবিন্দায় নমো নমঃ।৬৫

অনুবাদঃ-প্রহ্লাদ বলিলেন -হে পুন্ডরীকাক্ষ! তোমাকে নমস্কার। হে পুরুষোত্তম! তোমাকে নমস্কার। হে সর্ব্বলোকাত্মন্! তোমাকে নমস্কার। হে তিগ্মচক্রিণে! তোমাকে নমস্কার।৬৪

গো-ব্রাহ্মণের হিতকারী ব্রহ্মণ্যদেবকে নমস্কার; জগতের হিতস্বরূপ কৃষ্ণকে নমস্কার। গোবিন্দকে নমস্কার।৬৫...................................

এইভাবে সর্বব্যাপী অনন্ত ভগবান অচ্যুতের স্তব ও ধ্যান করিতে করিতে অভেদজ্ঞানে প্রহ্লাদের অদ্বৈত সিদ্ধি হইল এইভাবে-

সর্ব্বগত্বাদনন্তস্য স এবাহমবস্থিতঃ।

মত্তঃ সর্বমহং সর্ব্বং ময়ি সর্ব্বং সনাতনে।। ৮৫

অহমেবাক্ষয়ো নিত্যংপরমাত্মাত্মসংশ্রয়ঃ।

ব্রহ্মসংজ্ঞোহহমেবাগ্রে তথান্তে চ পুরঃ পূমান্।। ৮৬

অনুবাদঃ- অনন্তের সর্ব্বব্যাপিত্বজন্য তিনিই আমি, আমা হইতে সমস্ত উৎপন্ন; আমিও সর্ব্বরূপে বর্তমান এবং সনাতনরূপ আমাতেই লয় প্রাপ্ত হইবে।৮৫

আমিই সৃষ্টির পূর্ব্বে অক্ষয়, নিত্য ও সমস্ত জীবাত্মার অধিষ্ঠাতা ব্রহ্মনামক পরমাত্মা এবং আমিই শেষে পরমপুরুষ।৮৬

তৎপরে বিংশঃ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে

পরাশর উবাচ।

বং সঞ্চিন্তয়ন্ বিষ্ণুমভেদেনাত্মনো দ্বিজ।

তন্ময়ত্বমবাপাগ্র্যং মেনে চাত্মানমচ্যুতম্।।১

বিসস্মার তথাত্মানং নান্যৎ কিঞ্চিদ্জানত।

অহমেবাব্যয়োহনন্তঃ পরমাত্মেত্যচিন্তয়ৎ।।২

তস্য তদ্ ভাবনাযোগাৎ ক্ষীণপাপস্য বৈ ক্রমাৎ।

শুদ্ধেহন্তঃকরণে বিষ্ণুস্তস্থৌ জ্ঞানময়েহচ্যুতঃ।।৩

অনুবাদঃ- পরাশর বলিলেন-হে দ্বিজ! শ্রীভগবান বিষ্ণুকে এইরূপে আপনা হইতে অভিন্ন ভাবিতে ভাবিতে নিতান্ত তন্ময়ত্ব প্রাপ্ত হইয়া প্রহ্লাদ নিজেকে অচ্যুত মনে করিয়াছিলেন। তৎকালে তিনি নিজেকে বিস্মৃত হইয়াছিলেন। বিষ্ণু ব্যতীত অন্য কিছুই জানিতে পারেন নাই এবং আমিই অব্যয় অনন্ত পরমাত্মা এইরূপে চিন্তা করিয়াছিলেন। এইরূপ ভাবনাযোগে ক্রমে নিষ্পাপ (সমস্ত কর্ম্মবাসনারহিত) হইলে, তাঁহার জ্ঞানময় শুদ্ধ অন্তঃকরণে অচ্যুত বিষ্ণু স্থিত হইয়াছিলেন।১,২,৩

মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীরামঃ-

 


বাল্মীকি রামায়ণের বালকান্ডের প্রথম সর্গে মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীরামের পরিচয় প্রস্ফুটিত হইয়াছে এইভাবে- “মহর্ষি বাল্মীকি তপোনিরত স্বাধ্যায়সম্পন্ন বেদবিদ্ দিগের অগ্রগণ্য মুনিবর নারদকে সম্বোধনপূর্বক কহিলেন-দেবর্ষে ! এক্ষণে এই পৃথিবীতে কোন ব্যক্তি গুণবান, বিদ্বান, মহাবল পরাক্রান্ত, মহাত্মা, ধর্মপরায়ণ, সত্যবাদী, কৃতজ্ঞ, দৃঢ়ব্রত ও সচ্চরিত্র আছেন ? কোন ব্যক্তি সকল প্রাণীর হিতসাধন করিয়া থাকেন ? কোন ব্যক্তি লোকব্যবহারকুশল, অদ্বিতীয়, সুচতুর ও প্রিয়দর্শন ? কোন ব্যক্তিই বা রোষ ও অসূয়ার বশবর্তী নহেন ? রণস্থলে ক্ৰোধজাত হইলে কাহাকে দেখিয়া দেবতারাও ভীত হন ? হে তপোধন ! এইরুপ গুণসম্পন্ন মনুষ্য কে আছেন, তাহা আপনিই বিলক্ষণ জানেন। এক্ষণে বলুন, ইহা শ্রবণ করিতে আমার একান্ত কৌতুহল উপস্থিত হইয়াছে। ত্রিলোকদর্শী দেবর্ষি নারদ বাল্মীকির বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে সম্ভাষণপূর্বক পুলকিত মনে কহিলেন, তাপস! তুমি যে-সমস্ত গুণের কথা উলেখ করিলে তৎসমূদয় সামান্য মনুষ্যে নিতান্ত সুলভ নহে। যাহাই হউক, এইরূপ গুণবান মনুষ্য এই পৃথিবীতে কে আছেন, এক্ষণে আমি তাহা স্মরণ করিয়া কহিতেছি, শ্রবণ কর। রাম নামে ইক্ষ্বাকুবংশীয় সুবিখ্যাত এক নরপতি আছেন। তাঁহার বাহুযুগল আজানুলম্বিত, স্কন্ধ অতি উন্নত, গ্রীবাদেশ রেখাত্রয়ে অঙ্কিত, বক্ষঃস্থল অতি বিশাল, মস্তক সুগঠিত, ললাট অতি সুন্দর, নেত্ৰ আকৰ্ণবিস্তৃত ও গাত্রবর্ণ স্নিগ্ধ। তিনি নাতিদীর্ঘ ও নাতিহ্রস্ব; তাঁহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রমাণানুরূপ ও বিরল। সেই সর্বসুলক্ষণসম্পন্ন সর্বাঙ্গসুন্দর মহাবীর রাম অতিশয় বুদ্ধিমান ও সদ্বক্তা। তিনি ধর্মজ্ঞ, সত্যপ্রতিজ্ঞ, বিনীত ও নীতিপরায়ণ; তাঁহার চরিত্র অতি পবিত্র; তিনি যশস্বী, জ্ঞানবান, সমাধিসম্পন্ন, ও জীবলোকের প্রতিপালক এবং বর্ণাশ্রম ধর্ম ও স্বধর্মের রক্ষক। তিনি আত্মীয়স্বজন সকলকেই রক্ষা করিতেছেন। তিনি প্রজাপতিসদৃশ ও শত্রুনাশক। তিনি অনুরক্ত ভক্তকে আশ্রয় দিয়া থাকেন। তিনি বেদ-বেদাঙ্গে পারদর্শী, ধনুর্বিদ্যাবিশারদ, মহাবীর্য্যশালী, ধৈর্যশীল ও জিতেন্দ্রিয়। তিনি বেদাদি সর্ব শাস্ত্ৰজ্ঞ, প্রতিভাসম্পন্ন ও স্মৃতিশক্তি-যুক্ত। সকল লোকেই তাঁহার প্রতি প্রীতি প্রদর্শন করিয়া থাকে। তিনি অতি বিচক্ষণ, সদাশয় ও তেজস্বী। নদীসকল যেমন মহাসাগরকে সেবা করে, সেইরূপ সাধুগণ সততই তাঁহার সেবা করিয়া থাকেন। তিনি শত্ৰু-মিত্রের প্রতি সমদর্শী ও অতিশয় প্রিয়দর্শন। সেই কৌশল্যাগর্ভসম্ভূত লোকপূজিত রাম গাম্ভীর্য্যে সমুদ্রের ন্যায়, ধৈর্যে হিমাচলের ন্যায়, বলর্বীযে ভগবান বিষ্ণুর ন্যায়, সৌন্দর্যে চন্দ্রের ন্যায়, ক্ষমায় পৃথিবীর ন্যায়, ক্ৰোধে কালানলের ন্যায়, বদান্যতায় কুবেরের ন্যায় ও সত্যনিষ্ঠায় দ্বিতীয় ধর্মের ন্যায় কীর্তিত হইয়া থাকেন। তিনি রাজা দশরথের সর্বজ্যেষ্ঠ ও গুণ-শ্রেষ্ঠ পুত্র।" -(বাল্মীকি রামায়ণ, বালকান্ড, সর্গ-১)

মুক্তিমন্দিরের দ্বিতীয় দ্বারপাল হইল বিচারঃ-


 

মহর্ষি বশিষ্ঠদেব বলিলেন-'হে রাম! মুক্তিমন্দিরের দ্বিতীয় দ্বারপাল হইল বিচার। শাস্ত্রসহায়ে নির্ম্মল বুদ্ধি দ্বারা সর্ব্বদা আত্মবিচার করা কর্ত্তব্য।'

বিচারাৎ তীক্ষ্নতামেত্য ধীঃ পশ্যতি পরংপদম্।

দীর্ঘ-সংসার-রোগসা বিচারো হি মহৌষধম্।।-(যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ, মুমুক্ষু প্রকরণ,১৪।২)

অর্থাৎ বিচার দ্বারা বুদ্ধি সমধিক নির্ম্মল ও তীক্ষ্ন হইলেই পরমপদ লাভ করা যায়। বিচারই হইল এই সুদীর্ঘ সংসাররূপ ব্যাধির মহৌষধ।

কোহহং কথময়ং দোষঃ সংসারাখ্য উপাগতঃ।

ন্যায়েনেতি পরামর্শো বিচার ইতি কথ্যতে।।-(যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ, মুমুক্ষু প্রকরণ,১৪।৫০)

অর্থাৎ আমি কে? কি প্রকারে এই সংসার নামক দোষ উৎপন্ন হইল এবং ইহা নিবারণের উপায় কি?- বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্রসহায়ে এবং আচার্য্যের উপদেশ অনুসারে তাহা অনুসন্ধানের নাম বিচার।

ভগবান শ্রীরামের পিতৃপ্রতিজ্ঞায় দৃঢ়তা ও ভরতের জ্যেষ্ঠভ্রাতার প্রতি অপূর্ব ভক্তিঃ-

 


শ্যামবর্ণ পদ্মপলাশলোচন শ্রীরাম মত্ত হংসের ন্যায় কলকন্ঠে বললেন, 'বৎস! তুমি পৃথিবী শাসন করতে সমর্থ, এখন অমাত্য সুহৃদ ও বুদ্ধিমান মন্ত্রীগণের মন্ত্রণা অনুসারে রাজ্য পালন কর।'-

'লক্ষ্মীশ্চন্দ্রাদপেয়াদ্ বা হিমবান্ বা হিমং ত্যজেৎ।

অতীয়াৎ সাগরো বেলাং ন প্রতিজ্ঞামহং পিতুঃ।।'-(বাল্মীকি রামায়ণ, অযোধ্যাকান্ড, সর্গ-১১২।১৮)

-'চন্দ্রের শোভা অপনীত হতে পারে, হিমালয় হিম ত্যাগ করতে পারেন, কিন্তু পিতার প্রতিজ্ঞা আমি লঙ্ঘন করতে পারব না।'

ভরত বললেন, 'হে আর্য! আপনার হেমভূষিত পাদুকাদ্বয় দিন, তারাই রাজ্যের যোগক্ষেম বিধান করবে। আমি জটাচীরধারী ফলমূলাশী হয়ে আপনার প্রতিক্ষায় চতু্দর্শ বর্ষ নগরের বাইরে বাস করব, সমস্ত রাজকার্য আপনার পাদুকাকে নিবেদন করে সম্পাদন করব। চতুর্দশ বর্ষ সম্পূর্ণ হলে যদি আপনাকে না দেখি তবে হুতাশনে অর্থাৎ অগ্নিতে প্রবেশ করব।'..........

রাবণবধ

 


'অনন্তর সুরসারথি মাতলির পরামর্শে ভগবান রঘুবীর শ্রীরাম ব্রহ্মাস্ত্র গ্রহণ করিলেন। পূর্বে অপরিচ্ছিন্নপ্রভাব ভগবান প্রজাপতি ত্ৰিলোকজয়ার্থী ইন্দ্রকে ঐ অস্ত্র প্রদান করেন। পরে শ্রীরাম মহর্ষি অগস্ত্য হইতে উহা অধিকার করিয়াছেন। ঐ অস্ত্রের পক্ষদ্বয়ে পবন, ফলমুখে অগ্নি ও সূর্য, শরীরে মহাকাশ এবং গুরুতায় সুমেরু ও মন্দর পর্বত অধিষ্ঠান করিতেছেন। উহা মহাভূত সমষ্টির সারাংশে নির্মিত, স্বতেজপ্রদীপ্ত, রক্তমেদলিপ্ত, সধূম প্রলয়বহ্নির ন্যায় করালদর্শন এবং বজ্রবৎ কঠোর ও ঘোরনাদী।  উহা রুষ্ট সর্পের ন্যায় ভীষণ এবং কৃতান্তবৎ উগ্রদর্শন। বানরগণ ঐ ব্রহ্মাস্ত্র দেখিয়া আনন্দিত হইল এবং রাক্ষসেরা অবসন্ন হইয়া গেল। মহাবল রাম বেদোক্ত বিধানক্রমে উহা মন্ত্রপূত করিয়া শরাসনে যোজনা করিলেন। অস্ত্র যোজিত হইবামাত্র সমস্ত প্রাণী ভীত ও পৃথিবী কম্পিত হইয়া উঠিল। রাম ক্ৰোধে অধীর হইয়া রাবণের প্রতি উহা পরিত্যাগ করিলেন। বজ্রবৎ দুর্ধর্ষ কৃতান্তের ন্যায় দুর্নিবার ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষিপ্ত হইবামাত্র মহাবেগে রাবণের বক্ষে গিয়া পড়িল এবং ঝটিতি উহার বক্ষভেদ ও প্রাণহরণপূর্বক রক্তাক্ত দেহে ভূগর্ভে প্রবেশ করিল। রাবণের হস্ত হইতে সহসা শর ও শরাসন স্খলিত হইয়া পড়িল। সে বজ্রাহত বৃত্রাসুরের ন্যায় রথ হইতে ভীমবেগে ভূতলে পতিত হইল।'

-(বাল্মীকি রামায়ণ, যুদ্ধকাণ্ড, নবাধিকশততম সর্গ)

দুষ্কৃতিকারীদের বিনাশার্থ ভগবান সর্বদা প্রকট হয়ে ধর্ম্মসংস্থাপন করেন। অশুভশক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির,অধর্ম্মের বিরুদ্ধে ধর্ম্মের আর অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

Friday, 18 November 2022

রামের বিক্রম

 


বিনয় স্বভাবকে যাঁহারা দূর্বলতা ভাবিয়া থাকে তাঁহাদের উদ্দেশ্যে রঘুবীর ভগবান শ্রীরামচন্দ্র বলিতেছেন-'হে লক্ষ্মণ! আমি মৃদুভাব, লোকহিতে রত, সংযতেন্দ্রিয় ও করুণাশীল; সেইজন্য দেবগণ নিশ্চয় আমাকে নির্বীর্য্য মনে করেন। আমার গুণই দোষ হইয়া পড়িয়াছে। দেখ লক্ষণ, জরা, মৃত্যু, কাল ও দৈবকে যেমন কেহ কখনও প্রতিহত করিতে পারে না, সেইরূপ ক্রোধাবিষ্ট আমাকেও কেহ নিবারণ করিতে পারিবে না।'-(বাল্মীকি রামায়ণ, অরণ্যকাণ্ড, ৫৪।৫৫,৭৬)

প্রলয়কালে রুদ্রের ন্যায় লোকসংহারে উদ্যত রামচন্দ্রের অদৃষ্টপূর্ব ক্রুদ্ধ মূর্ত্তি দেখিয়া ভীত লক্ষ্মণ কৃতাঞ্জলি হইয়া রামকে বললিলেন-'আপনি সর্ব্বদা সর্ব্বভূতের হিতকারী, ক্রোধের বশবর্ত্তী হইয়া আপনি স্বীয় স্বভাব বিসর্জ্জন দিবেন না। আপনি শান্ত হউন।'

লক্ষ্মণের বীরবাণী

 


ভীমবাহু রামানুজ লক্ষ্মণ বলিলেন-'যে বিহ্বল বীর্যহীন সে দৈবের অনুসরণ করে। যারা বীর এবং আত্মনির্ভরশীল তারা দৈবের উপাসনা করে না। পুরুষকার দ্বারা দৈবকে যে বাধা দিতে সমর্থ সে দৈবক্রমে অকৃতার্থ হলেও অবসন্ন হয় না। আজ লোকে দৈবের শক্তি ও পুরুষের পৌরুষ দেখবে, আজ দৈব ও মানুষের বলাবল প্রকট হবে। যারা তোমার রাজ্যাভিষেক দৈবকর্তৃক ব্যাহত দেখেছে আজ তারাই সেই দৈবকে আমার পৌরুষে পরাভূত দেখবে।'

-(বাল্মীকি রামায়ণ, অযোধ্যাকাণ্ড, সর্গ ২৩। ১৬-১৯)

শবরীর ইষ্টলাভঃ-

 


বাল্মীকি রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডের সর্গ ৭৪-৭৫ এ বর্ণিত আছে- কবন্ধের প্রদর্শিত পথে যাত্রা করে রাম-লক্ষ্মণ পম্পার পশ্চিম তীরে শবরীর আশ্রমে উপস্থিত হলেন। সিদ্ধা শবরী তাঁদের চরণবন্দনা করে পাদ্য আচমনীয় প্রভৃতি দিয়ে সম্মাণ করলেন।..বৃদ্ধা শবরী শ্রীরামের সম্মুখে এসে উত্তর দিলেন-

অদ্য প্রাপ্তা তপস্সিদ্ধিস্তব সংদর্শনান্ময়া৷

অদ্য মে সফলং তপ্তং গুরবশ্চ সুপূজিতাঃ৷৷

অদ্য মে সফলং জন্ম স্বর্গশ্চৈব ভবিষ্যতি৷

ত্বয়ি দেববরে রাম পূজিতে পুরুষর্ষভ৷৷

চক্ষুষা তব সৌম্যেন পূতাস্মি রঘুনন্দন৷

গমিষ্যাম্যক্ষযান্লোকাংস্ত্বত্প্রসাদাদরিন্দম৷৷-(বাল্মীকি রামায়ণ, অরণ্যকাণ্ড, সর্গ ৭৪। ১১-১৩)

-আজ তোমাকে দেখে আমার তপস্যার সিদ্ধিলাভ হল, আজ আমার জন্ম সফল, গুরুপূজাও সার্থক। হে পুরুষশ্রেষ্ঠ রাম! তুমি দেবগণেরও শ্রেষ্ঠ, আজ তোমার পূজা করে আমার তপস্যার ফলস্বরূপ স্বর্গলাভ হবে৷ রঘুনন্দন! তোমার সৌম্যদৃষ্টিতে আমি পূত হয়েছি। হে অরিন্দম! তোমার প্রসাদে আমি অক্ষয়লোক লাভ করব।

শিবগায়ত্রী

 


কৃষ্ণযজুর্বেদীয় মহানারায়ণ উপনিষদের তৃতীয় খণ্ডে মহাদেবের উদ্দেশ্যে যে মন্ত্রগুলো নিবেদিত তন্মধ্যে দ্বিতীয় মন্ত্রটি রুদ্র গায়ত্রীমন্ত্র হিসেবে প্রসিদ্ধ-

তৎপুরুষস্য বিদ্মহে সহস্রাক্ষস্য মহাদেবস্য ধীমহি।

তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ।।-(মহানারায়াণ উপনিষৎ, তৃতীয়খণ্ড-১)

সেই পুরুষকে (পরব্রহ্মকে) আমরা জানব। সহস্রচক্ষু মহাদেবের ধ্যান করব। সেই ধ্যানে রুদ্র আমাদের প্রেরণা দান করুন।।১

তৎপুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি।

তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ।।-(মহানারায়াণ উপনিষৎ, তৃতীয়খণ্ড-২)

সেই মহান দেবতাকে আমরা জানব। মহাদেবের ধ্যান করব। সেই ধ্যানে রুদ্র আমাদের প্রেরণা দান করুন।।২

তৎপুরুষায় বিদ্মহে নন্দিকেশ্বরায় ধীমহি।

তন্নো বৃষভঃ প্রচোদয়াৎ।।-(মহানারায়াণ উপনিষৎ, তৃতীয়খণ্ড-৩)

সেই পরমপুরুষের স্বরূপ আমরা জানব। নন্দিকেশ্বরের ধ্যান করব। সেই ধ্যানে শক্তিসম্পন্ন দেবতা আমাদের প্রেরণা দান করুন।।৩

.................................................................................... 

শ্রীশুভ চৌধুরী

নভেম্বর ১০, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ।

রাজসূয় যজ্ঞসভায় কাহাকে শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য প্রদান করিব?

 


যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞ আরম্ভ হইল।  যুধিষ্ঠিরের সভার অর্ঘ দিতে হইবেকে ইহার উপযুক্ত পাত্র? ভারতবর্ষীয় সমস্ত রাজগণ সভাস্থ হইয়াছেন, ইহার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কে? ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের এই প্রশ্নের উত্তরে-'ততো ভীষ্মঃ শান্তনবো বুদ্ধ্যা নিশ্চিত্য বীর্য্যবান্। অমন্যত তদা কৃষ্ণমহর্ণীয়তম্ ভূবি।।'-(মহাভারত, সভাপর্ব, ৩৫।২৭)

তারপর বীর্য্যবান শান্তনুনন্দন ভীষ্ম বুদ্ধিদ্বারা নিশ্চয় করিয়া ভূমণ্ডলে শ্রীকৃষ্ণকেই পূজ্যতম ব্যক্তি বলিয়া মনে করিলেন। ভীষ্ম বলিলেন, “কৃষ্ণই তেজঃ বল ও পরাক্রম বিষয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ। ইঁহাকে অর্ঘ প্রদান কর। ইনি জ্যোতিষ্কগণের মধ্যে ভাস্কর সদৃশ। ইঁহার উপস্থিতিতে এই সভা আলোকিত হইয়াছে। ভীষ্ম বলিলেন, “এই মহতী নৃপসভায় একজন মহীপালও দৃষ্ট হয় না, যাহাকে কৃষ্ণ তেজোবলে পরাজয় করেন না। অচ্যুত কেবল আমাদিগের অর্চনীয় এমত নহে, সেই মহাভুজ ত্রিলোকীর পূজনীয়। তিনি যুদ্ধে অসংখ্য ক্ষত্রিয়বর্গের পরাজয় করিয়াছেন, এবং অখণ্ড ব্রহ্মাণ্ড তাঁহাতেই প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। কৃষ্ণ জন্মিয়া অবধি যে সকল কার্য করিয়াছেন, লোকে মৎসন্নিধানে পুনঃ পুনঃ তৎসমুদায় কীর্তন করিয়াছে। তিনি অত্যন্ত বালক হইলেও আমরা তাঁহার পরীক্ষা করিয়া থাকি। কৃষ্ণের শৌর্য, বীর্য, কীর্তি ও বিজয় প্রভৃতি সমস্ত পরিজ্ঞাত হইয়া সেই ভূতসুখাবহ জগদর্চিত অচ্যুতের পূজা বিধান করিয়াছি। কৃষ্ণের পূজ্যতা বিষয়ে দুটি হেতু আছে; তিনি নিখিল বেদবেদাঙ্গপারদর্শী ও সমধিক বলশালী। ফলতঃ মনুষ্যলোকে তাদৃশ বলবান্ এবং বেদবেদাঙ্গসম্পন্ন দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রত্যক্ষ হওয়া সুকঠিন। দান, দাক্ষ্য, শ্রুত, শৌর্য, লজ্জা, কীর্তি, বুদ্ধি, বিনয়, অনুপম শ্রী, ধৈর্য ও সন্তোষ প্রভৃতি সমুদায় গুণাবলী কৃষ্ণে নিয়ত বিরাজিত রহিয়াছে। অতএব সেই সর্বগুণসম্পন্ন আচার্য, পিতা ও গুরুস্বরূপ পূজার্হকৃষ্ণের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন তোমাদের সর্বতোভাবে কর্তব্য তিনি ঋত্বিক্, গুরু, সম্বন্ধী, স্নাতক, রাজা এবং প্রিয়পাত্র। এই নিমিত্ত অচ্যুত অর্চিত হইয়াছেন। কৃষ্ণই এই চরাচর বিশ্বের সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়কর্তা, তিনিই অব্যক্ত প্রকৃতি, সনাতন, কর্তা, এবং সর্বভূতের অধীশ্বর, সুতরাং পরমপূজনীয়, তাহাতে আর সন্দেহ কি? বুদ্ধি, মন, মহত্ত্ব, পৃথিব্যাদি পঞ্চ ভূত, সমুদায়ই একমাত্র কৃষ্ণে প্রতিষ্ঠিত আছে। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, দিক্‌বিদিক্ সমুদায়ই একমাত্র কৃষ্ণে প্রতিষ্ঠিত আছে।

ভীষ্মের অনুমতিক্রমে সহদেব ভগবান শ্রীকৃষ্ণকেই শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য প্রদান করিলেন।

স্বর্গের দ্বার কি?

 


শ্রীমহাভারতে আদিপর্বের নবতিতম অধ্যায়ে যযাতি কহিলেন, “হে অষ্টক! তপস্যা, দান, শম, দম, লজ্জা, সরলতা এবং দয়া এই সাতটি স্বর্গের দ্বার-স্বরূপ। সাধুলোকেরা কহিয়া থাকেন, মনুষ্যেরা অজ্ঞানকূপে মগ্ন হইয়া অহঙ্কারদোষে সর্ব্বদা বিনষ্ট হয়। অধ্যয়নশীল পাণ্ডিত্যাভিমানী যে ব্যক্তি বিদ্যবলে অন্যের যশোলোপ করে, সে পুণ্যলোক হইতে অচিরাৎ ভ্রষ্ট হয় এবং তাহারা সেই অধ্যয়নাদি ব্রহ্মফলপ্রদ হয় না। অগ্নিহোত্র, মৌনব্রত, অধ্যয়ন, যজ্ঞানুষ্ঠান এই চতুর্ব্বিধ কর্ম্ম শুভফলপ্রদ সন্দেহ নাই, কিন্তু দম্ভ-অহঙ্কারের সহিত অনুষ্ঠিত হইলে ইহার ফল ভয়ঙ্কর হয়। মানে হর্ষপ্রকাশ ও অপমানে সন্তাপ করিও না। সাধু ব্যক্তিরা সাধুদিগকে সর্ব্বদা সৎকার করিয়া থাকেন। অসাধুরা কদাচ সাধুবুদ্ধি লাভ করিতে পারে না। ‘এত দান করিলাম’, ‘এতব্রতানুষ্ঠান করিলাম, এইরূপ অহঙ্কার অতি ভয়ঙ্কর, অতএব ইহা যত্নপূর্ব্বক পরিত্যাগ করা কর্ত্তব্য। যে-সকল মনীষী সকলের আশ্রয়ভূত, তাঁহাদিগের সহিত সঙ্গত হইলে ইহলোকে কীর্ত্তি ও পরলোকে সদ্‌গতিলাভ হয়।”-(মহাভারত,কালী প্রসন্ন সিংহ অনুদিত)

শ্রীমহাভারতে ভগবান শিবের 'নীলকন্ঠ' নাম মাহাত্ম্যঃ-

 


মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ ব্যাস প্রণীত শ্রীমহাভারতের আদিপর্ব্বের অষ্টাদশ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

'সুরাসুর তথাপি ক্ষান্ত না হইয়া অনবরতই সমুদ্রমন্থন করিতে লাগিলেন। তাহাতে কালকুট গরল উৎপন্ন হইল। সধূম জ্বলদগ্নির ন্যায় সেই ভয়ঙ্কর গরল ধরণীতল আকুল করিল। কালকূটের কটুগন্ধ আঘ্রাণ করিয়া ত্রিলোকী মূর্চ্ছিত হইল। ব্রহ্মা তদবলোকনে ভীত হইয়া অনুরোধ করাতে সাক্ষাৎ মন্ত্রমূর্ত্তি ভগবান্ ভবানীপতি তৎক্ষণাৎ ঐ বিষম বিষরাশি পান করিয়া কণ্ঠে ধারণপূর্ব্বক ত্রৈলোক্য রক্ষা করিলেন। তদবধি তিনি নীলকণ্ঠ নামে খ্যাত হইয়াছেন।'

-(মহাভারত,কালীপ্রসন্ন সিংহ অনুদিত)

কিরূপ কর্ম্ম করা উচিত?

 


মানব ধৰ্ম্মশাস্ত্রের ভৃগুপ্রোক্তায়াং সংহিতার চতুর্থ অধ্যায়ে এ বর্ণিত আছে-

যৎ কর্ম কুর্বতোঽস্য স্যাৎ পরিতোষোঽন্তরাত্মনঃ।

তৎ প্রযত্নেন কুর্বীত বিপরীত তু বর্জয়েৎ ।।-(মনুস্মৃতি-৪।১৬১)

অর্থাৎ যে কাজ করলে অন্তরাত্মার পরিতোষ উৎপন্ন হয়, তাই যত্নপূর্ব্বক করবে এবং তার বিপরীত কাজ অর্থাৎ যা করলে আত্মার পরিতোষ জন্মেনা পরন্তু গ্লানি উপস্থিত হয় তা সর্বতোভাবে ত্যাগ করা উচিত।

মেধাতিথি ভাষ্যে বলিতেছেন- যে  কাজ করলে লোকনিন্দা না হয় তা করা উচিত। আর যাতে হৃদয় পরিতৃপ্ত হয় না, তা বর্জন করা কর্তব্য।

ধর্ম্মের মূল

 

"সমস্ত বেদ ধর্ম্মের মূল, বেদবেত্তা মন্বাদির স্মৃতি, তাঁহাদিগের ব্রহ্মণ্যতা প্রভৃতি ত্রয়োদশ প্রকার শীল, সাধুদিগের সদাচার এবং আত্মতুষ্টি এই সমুদয় ধৰ্ম্মের প্রমাণস্বরূপ।" -(মনুস্মৃতি-২/৬)

শ্রীকুল্লূক ভট্টের মন্বর্থ মুক্তাবলী টীকাতে ত্রয়োদশ প্রকার শীল বলতে বর্ণিত আছে-"বেদাধ্যয়ন, দেবতা এবং পিতৃপুরুষদের প্রতি ভক্তি, সৌম্যভাব (উগ্রতার অভাব), পরের অপকার না করা, অসূয়া না করা, মৃদুস্বভাব, পারুষ্যের (রুক্ষতার) অভাব, মৈত্রীভাব, প্রিয়বাদিতা, কৃতজ্ঞতা, আশ্রিতকে অভয় দান, করুণতা, প্রশান্তি।"

স্মৃতিতে বিপ্রদের ধর্ম্মের লক্ষণ অর্থাৎ স্বরূপ ও সর্বমনুষ্যের সাধারণ ধর্ম কথনঃ-

 


মানব ধৰ্ম্মশাস্ত্রে ভৃগুপ্রোক্তায়াং সংহিতায়াং ষষ্ঠোহধ্যায়ঃ এ বর্ণিত আছে-

ধৃতিঃ ক্ষমা দমোঽস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ |

ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষণম্ ||

দশ লক্ষণানি ধর্মস্য যে বিপ্রাঃ সমধীয়তে।

অধীত্য চানুবর্তন্তে তে যান্তি পরমা গতিম্ || -(মনুস্মৃতি,৬।৯২,৯৩)

মেধাতিথি ভাষ্য ও কুল্লূকভট্টের মন্বর্থমুক্তাবলী টীকানুারে বঙ্গানুবাদঃ-'ধৃতি অর্থাৎ সন্তোষ, ক্ষমা, দম অর্থাৎ ঔদ্ধত্য না থাকা তথা বিদ্যাপ্রভৃতি জনিত যে উদ্ধতভাব তা ত্যাগ করা, অস্তেয় অর্থাৎ অন্যায়পূর্বক পরধন হরণ না করা, শৌচ অর্থাৎ বাহ্য ও অভ্যন্তর শুচিতা রক্ষা করা তথা আহার প্রভৃতি বিষয়ে শুদ্ধি, ইন্দ্রিয় নিগ্রহ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়সমূহের স্ব স্ব বিষয় হইতে ইন্দ্রিয়গুলোকে প্রত্যাবৃত্ত করানো, ধী অর্থাৎ প্রতিপক্ষের সংশয়াদি নিরাকরণপূর্বক সম্যক্ জ্ঞান প্রাপ্তি, বিদ্যা অর্থাৎ আত্মজ্ঞান (ধী ও বিদ্যা-এ দুটির মধ্যে প্রভেদ এই যে-প্রথমটি কর্ম্মজ্ঞান ও দ্বিতীয়টি অধ্যাত্মজ্ঞান), সত্য এবং অক্রোধ'- এই দশটি ধর্ম্মের লক্ষণ অর্থাৎ স্বরূপ। যে সব বিপ্রব্রাক্ষণ ধর্মের এই দশটি লক্ষণ অধ্যয়ন করেন এবং আত্মজ্ঞান সহকারে ইহার অনুষ্ঠান করেন, তাঁহারা  ব্রহ্মজ্ঞানের উৎকর্ষজন্য মোক্ষরূপ পরমগতি লাভ করেন।

মানব ধৰ্ম্মশাস্ত্রে ভৃগুপ্রোক্তায়াং সংহিতায়াং দশমোহধ্যায়ঃ এ বর্ণিত আছে-

অহিসাং সত্যমস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ |

এতং সামাসিকং ধর্মং চাতুর্বর্ণ্যেঽব্রবীন্ মনুঃ ||-(মনুস্মৃতি-১০।৬৩)

মেধাতিথি ভাষ্য ও কুল্লূকভট্টের মন্বর্থমুক্তাবলী টীকানুারে বঙ্গানুবাদঃ- অহিংসা অর্থাৎ জীবিকার জন্য যেসব প্রাণী বধ্য বলিয়া নির্দিষ্ট আছে তদ্ ব্যতীত অন্যপ্রাণীর প্রতি হিংসা ত্যাগ, পরধনহরণ ইত্যাদি ত্যাগপূর্বক সত্য কথা বলা, মৃত্তিকা জল প্রভৃতি দ্বারা শরীরশুদ্ধি এবং ইন্দ্রিয়সংযম- এই চারটি ধর্ম বর্ণজাতি নির্বিশেষে সর্বমনুষ্যের পক্ষে সাধারণ ধর্ম অর্থাৎ সর্বসাধারণের অনুষ্ঠেয় বলে জানতে হবে।

স্মৃতিশাস্ত্রে মাতৃস্থান অতি উচ্চঃ-

 


মনুসংহিতাতে নারী শুধু পূজ্যা বা সম্মাণীয়া পদেই ভূষিত নহে, এই শাস্ত্রে মাতা পিতার থেকেও সহস্রগুণে মাননীয়া। মানব ধৰ্ম্মশাস্ত্রে ভৃগুপ্রোক্তায়াং সংহিতায়াং দ্বিতিয়োহধ্যায়ঃ এ বর্ণিত আছে-

উপাধ্যায়ান্ দশাচার্য আচার্যাণাং শতং পিতা |

সহস্রং তু পিতৄন্ মাতা গৌরবেণাতিরিচ্যতে ||| -(মনুস্মৃতি,২।১৪৫)

মেধাতিথি ভাষ্য ও কুল্লূকভট্টের মন্বর্থমুক্তাবলী টীকানুারে বঙ্গানুবাদঃ- দশজন উপাধ্যায় থেকে একজন আচার্য্যের গৌরব বেশি, উপনয়নপূর্বক গায়ত্রীমন্ত্রের উপদেষ্টা একশতজন আচার্য্যের থেকে গর্ভদানাদি সংস্কার- সম্পাদনকারী পিতার গৌরব বেশি এবং মাতা পিতার থেকেও সহস্রগুণে মাননীয়া হন।

Thursday, 17 November 2022

ব্রহ্মগীতায় শিবতত্ত্ব কথনঃ-

 


এষ দাতা চ কর্ত্তা চ সংহর্ত্তা চ যুগে যুগে। ২

অর্থাৎ ঈশ্বর মহাদেবই যুগে যুগে দাতা, কর্ত্তা এবং সংহর্ত্তা।

এবং জ্ঞানং পরংব্রহ্ম প্রশান্তং নির্ম্মলং শিবম্।।৪

 অব্যক্তঞ্চৈব ব্যক্তঞ্চ জ্ঞানঞ্চাজ্ঞানমেবচ।

সাংখ্যং যোগং পরং সাংখ্যং যঃ পশ্যতি স পশ্যতি। ৫

অর্থাৎ তিনি জ্ঞানাতীত পরব্রহ্ম, প্রশান্ত, নির্ম্মল, শিব, ব্যক্ত তথাপি অব্যক্ত, জ্ঞান-অজ্ঞানস্বরূপ, সাংখ্য-যোগস্বরূপ; যে ব্যক্তি তত্ত্বজ্ঞানগম্য শিবকে দর্শন করে, সে যথার্থ জানিতে পারে।

-(শিবমহাপুরাণ, সনৎকুমার সংহিতা, ব্রহ্মাকর্তৃক কথিত ব্রহ্মগীতা নামক নবম অধ্যায়)

‘নমঃ শিবায়' পঞ্চাক্ষর মন্ত্রের যথার্থ মাহাত্ম্যঃ-

 


শিব মহাপুরাণের বায়বীয় সংহিতার উত্তরভাগে পঞ্চাক্ষরমন্ত্রতত্ত্বনিরূপণং নাম দ্বাদশ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

বেদে ও শিবাগমে ঐ পঞ্চাক্ষর মন্ত্র ষড়াক্ষরে উক্ত আছে এবং লোকে পঞ্চাক্ষররূপে প্রকাশ পাইয়া থাকে। সর্বজ্ঞ শঙ্কর সকল দেহীর অশেষ অর্থসিদ্ধি নিমিত্ত অল্পাক্ষর সমন্বিত হইলেও অর্থবহুল, মুক্তিপ্রদ, নানা সিদ্ধিভূষিত, লোকচিত্তানুরঞ্জক, বিনিশ্চিতার্থ, সুখোচ্চার্য্য, বেদসার ' নমঃ শিবায়' এই আজ্ঞাসাধক অসন্দিগ্ধ দিব্য মন্ত্র উপদেশ দিয়াছেন।

ঐ সর্বশ্রেষ্ঠ আদিম ষড়াক্ষর মন্ত্র নিখিল বিদ্যার বীজ, বটবীজ-সদৃশ অতিসুক্ষ্ম মহান অর্থের সাধন। ত্রিগুণাতীত সর্বজ্ঞ সর্বস্রষ্টা সর্বব্যাপী ভগবান্ শিব  প্রণবরূপ একাক্ষর মন্ত্রে অধিষ্ঠান করিতেছেন। সূক্ষ্ম ঈশানাদি একাক্ষর পাঁচটি মন্ত্র 'নমঃ শিবায়' এই মন্ত্রে যথাক্রমে অধিষ্ঠান করিতেছেন।

শিবাগমে সেই ভগবান্ আদিমধ্যান্তশূন্য, স্বভাব-বিমল, পরিপূর্ণ, সর্বজ্ঞ ও প্রভুরূপে জ্ঞেয় হন। ঐ মন্ত্র সেই শিবের অভিধান, সুতরাং তিনি সেই মন্ত্রের অভিধেয়, অতএব ঐপ্রকারে অভিধান-অভিধেয় ভাব থাকাতে মন্ত্রও পরমপুরুষ শিব বলিয়া প্রসিদ্ধ। ' নমঃ শিবায়' এতাবন্মাত্রই শিবজ্ঞান, এবং এতাবন্মাত্রই পরমপদ বলিয়া বিদিত হয়, যেহেতু ঐ ষড়ক্ষর মন্ত্রকে শিব স্বয়ং বলিয়াছেন।

....................................................................................

তথ্যসূত্রঃ- শিবপুরাণ, পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত ও শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ কর্তৃক পরিদৃষ্ট।

শুভাবহ স্তবঃ-

 


শিব মহাপুরাণের জ্ঞানসংহিতার ত্রিপুরোপখ্যানে এয়োবিংশোহধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

দেবা উচুঃ।

শঙ্করায় নমস্তেহস্তু নমস্তে পরমাত্মনে।

পরাবরস্বরূপায় নমস্তে শূলপাণয়ে।। ১৯

দেবগণ বলিলেন-'হে শঙ্কর! হে পরমাত্মন্! আপনাকে নমস্কার করি। হে শূলপাণে! আপনি পরাবর (উচ্চনীচ-) স্বরূপ, আপনার উদ্দেশ্যে এই দেবগণের অসংখ্য নমস্কার। ১৯

নমো গণাধিদক্ষায় কপর্দ্দিনে নমোহস্তু তে।

নমোহস্তু তে ত্রিনেত্রায় বেদানাং পতয়ে নমঃ।২০

হে গণাধিপ!  হে কপর্দ্দিন!  আপনাকে আমরা নমস্কার করি। হে ত্রিনেত্র!  আপনি বেদপতি, আপনাকে আমাদের কোটি কোটি নমস্কার।২০

কার্য্যকারণরূপায় মূলপ্রকৃতিহেতবে।

ব্যাপ্যায় চ নমস্তুভ্যং ব্যাপকায় নমো নমঃ। ২১

হে প্রভো! আপনিই এই জগতের কারণ, আবার আপনিই কার্য্যরূপী; হে মূলপ্রকৃতিহেতো! আপনিই এই জগতের ব্যাপক, আবার আপনিই ব্যাপ্য, এহেন আপনাকে আমরা সদা অসংখ্য নমস্কার করি।'২

শিবলিঙ্গ পরমতত্ত্বঃ-

 


শিব মহাপুরাণের জ্ঞানসংহিতার জ্যোতির্লিঙ্গ প্রাদুর্ভাববর্ণনং নামক দ্বিতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত আছে- ব্রহ্মাবিষ্ণু উভয়ের বিবাদ শান্তি ও জ্ঞানোদয়ের জন্য উভয়ের মধ্যস্থলে সহস্র সহস্র জ্বালামালাসঙ্কুল কানানল-সন্নিভ একটি অদ্ভূত জ্যোতির্ম্ময় লিঙ্গ উদ্ভূত হইল। এই লিঙ্গের স্বরূপ হইল-

ক্ষয়-বৃদ্ধিবিনির্ম্মুক্তমাদিমধ্যান্তবর্জ্জিতম্।

অনৌপম্যমনির্দ্দিষ্টমব্যক্তং বিশ্বসম্ভবম্।। ৬৪

তাঁহার ক্ষয় বৃদ্ধি নাই, আদি মধ্য অন্ত নাই; তিনি অতুলনীয় অনির্দ্দেশ্য অব্যক্ত এবং জগতের মূল কারণ।৬৪

এই জ্ঞানসংহিতার তৃতীয় অধ্যায়ে শিবলিঙ্গকে ধ্যানমার্গেরও অগোচর বলা হইয়াছে-

'অনির্দ্দেশ্যঞ্চ তদ্রূপনাম কর্ম্মবর্জ্জিতম্।

অলিঙ্গং লিঙ্গতাং যাতং ধ্যানমার্গেহপ্যগোচরম্।। ৬

'এ কি! অনির্দ্দেশ্য, নামকর্ম্ম-বিবর্জ্জিত, এরূপ বস্তুতঃ লিঙ্গ না হইলেও লিঙ্গরূপে পরিণত হইয়াছে। ইহা ধ্যানমার্গেরও অগোচর। ৬

এই তৃতীয় অধ্যায়ে আরও বর্ণিত আছে- তখন তথায় আনন্দময় ওঙ্কারাত্মক সুব্যক্ত ত্রিমাত্র শব্দ সম্ভূত হইল।

লিঙ্গস্য দক্ষিণভাগে তদাপশ্যৎ সনাতনম্।১০

আদ্যং বর্ণমকারন্তু উকারঞ্চোত্তরে ততঃ।

মকারং মধ্যতশ্চৈব নাদান্তং তস্য চোমিতি।। ১১

সূর্য্যমণ্ডলবদ্দৃষ্ট্বা বর্ণমাদ্যন্তু দক্ষিণে।

উত্তরে পাবকপ্রখ্যমুকারমৃষিসত্তম।। ১২

শীতাংশুমণ্ডলপ্রখ্যং মকারং তস্য-মধ্যতঃ।

তস্যোপরি তদাপশ্যং স্ফটিকপ্রভবং পরম্।। ১৩

তুরীয়াতীতমমৃতং নিষ্কলং নিরুপপ্লবম্।

নির্দ্বন্দ্বং কেবলং তত্ত্বং বাহ্যাভ্যন্তরবর্জ্জিতম্।।১৪

আদিমধ্যান্তরহিতমানন্দস্যাপি কারণম্।

সত্যমানন্দমমৃতং পরং ব্রহ্ম পরায়ণম্।।১৫

তখন লিঙ্গের দক্ষিণভাগে সনাতন আদ্যবর্ণ অকার আমাদিগের দৃষ্টিগোচর হইল। তাঁহার উত্তরে উকার এবং মধ্যে নাদধ্বনিসমন্বিত মকার-আমরা এইরূপে ওঙ্কার অবলোকন করিলাম। হে ঋষিবর! আমরা লিঙ্গের দক্ষিণভাগে সূর্য্যমণ্ডলপ্রখ্য আদিবর্ণ, উত্তরভাগে অনল-সন্নিভ উকার এবং মধ্যে চন্দ্রমণ্ডলসমুজ্জ্বল মকার অবলোকন করিয়া তদুপরিভাগে স্ফটিক-প্রকাশ তুরীয়াতীত অমৃত নিষ্কল নির্দ্বন্দ্ব একমেবাদ্বিতীয়ং পরমতত্ত্ব দর্শন করিলাম; তাহার আদি, মধ্য, অন্ত নাই; বাহ্য অভ্যন্তর নাই; তিনি আনন্দময় আনন্দকারণ সত্য অজর পরব্রহ্ম এবং পরমগতি।১০-১৫

দেবাদিদেব শিবের অষ্টমূর্ত্তি সমূহ কথনঃ-

 


সেই দেবাদিবের অষ্টমূর্ত্তিময় এই নিখিল জগৎ সেই অষ্টমূর্ত্তিতে, সূত্রে মণিগণের ন্যায় ব্যাপিয়া রহিয়াছে।

শর্ব্বো ভবস্তথা রুদ্র উগ্রো ভীমঃ পশোঃপতিঃ।

ঈশানশ্চ মহাদেবো মূর্ত্ত্যয়শ্চাষ্ট বিশ্রুতাঃ।।১৮

অর্থাৎ  সেই সকল অষ্টসংখ্যক মূর্ত্তি শর্ব্ব, ভব, রুদ্র, উগ্র, ভীম, পশুপতি, ঈশান ও মহাদেব এই আট নামে প্রসিদ্ধ। ১৮

সেই শর্ব্বাদি অষ্টমূর্ত্তিই ক্ষিতি, জল, অনল, অনিল, আকাশ, ক্ষেত্রজ্ঞ, সূর্য্য ও চন্দ্রে যথাক্রমে অধিষ্ঠান করিতেছেন। ইহা শাস্ত্রনিশ্চয় যে , পরমাত্মা শর্ব্বের পৃথিবী-রূপিণী শর্ব্ব নামে মূর্ত্তি স্থাবর-জঙ্গমাত্মক বিশ্বকে ধারণ করিতেছেন। জল-রূপিণী ভব নামের দ্বিতীয় মূর্ত্তি সমস্ত জগতের জীবন রক্ষা করিতেছেন।  রুদ্রের অঘোর-রূপিণী শুভজনিকা তেজোময়ী রুদ্রাখ্যা মূর্ত্তি জগতের বাহিরে ও অন্তরে ব্যাপিয়া অধিষ্ঠান করিতেছেন। বেধা উগ্রের পবনাত্মিকা যে মূর্ত্তি এই বিশ্বকে স্পন্দিত করিয়া ধারণ করিতেছেন এবং স্বয়ং স্পন্দিত হইতেছেন, পণ্ডিতেরা সেই মূর্ত্তিকে উগ্র নামে আখ্যায়িত করেন।

সকলের অবকাশদায়িনী গগনময়ী ভীমের ভীমাখ্য মূর্ত্তি সকল ভূতের ভেদসাধন করত এই অখিল বিশ্বকে ব্যাপিয়া রহিয়াছেন।  সর্ব্বক্ষেত্র-নিবাসী সর্ব্ব-রূপী ক্ষেত্রজ্ঞের অধিষ্ঠাত্রী পশুপতি নাম্নী ষষ্ঠমূর্ত্তি পশুদিগের পাশবন্ধন ছেদন করিতেছেন। নিখিল জগতের দীপ্তিজনিকা দিবাকরস্বরূপা মহেশের ঈশানাখ্য মূর্ত্তি আকাশ ব্যাপিয়া অবস্থান করিতেছেন। আর শিবের সোমময়ী মহাদেবাখ্য মূর্ত্তি সুধাংশু-বর্ষণে অখিল ভুবনের আনন্দোৎপাদন করিতেছেন। ১৯-২৭

আত্মনশ্চাষ্টমী মূর্ত্তিঃ শিবস্য পরমাত্মনঃ।

ব্যাপিকেতরমূর্ত্তীনাং বিশ্বং তস্মাচ্ছিবাত্মকম্।২৮

অর্থাৎ পরমাত্মা শিবের ঐ অষ্টম্ মূর্ত্তি স্বীয় অপরমূর্ত্তিগুলিকে ব্যাপিয়া আছেন বলিয়া, বিশ্ব শিবাত্মক নামে প্রসিদ্ধ।২৮

-(শিবমহাপুরাণ, বায়বীয়সংহিতা, উত্তরভাগ, মহেশস্যাষ্টমূর্ত্তিত্বকথন নামক চতুর্থ অধ্যায়)

শিবোহহম্

 


অবধূত বললেন-"গুণ-বিগুণ বিভাগ যাঁর মধ্যে নেই, রতি-বিরতি বিহীন, নির্মল, নিষ্প্রপঞ্চ তিনি। গুণ-নির্গুণহীন, ব্যাপক, বিশ্বরূপ ব্যোমরূপ সেই শিবকে আমি কিভাবে বন্দনা করি? হে সুমিত্র! শ্বেতাদি বর্ণরহিত, যিনি নিজেই কার্য-কারণ, বিকল্পরহিত অমল শিবস্বরূপ, যাঁকে নিজের আত্মাতেই আমি আত্মরূপে দেখতে পাচ্ছি, তাঁকে কেমন করে নমস্কার জানাই?"

-(অবধূত গীতা, তৃতীয় অধ্যায়-১,২)

ভাগবতে অদ্বৈতবেদান্তোক্ত দৃগ্-দৃশ্যবিবেক ও প্রতিবিম্ববাদ—

  সনৎকুমার মোক্ষের সাধন উপদেশ করতে গিয়ে বলছেন — দগ্ধাশয়ো মুক্তসমস্ততদ্গুণো নৈবাত্মনো বহিরন্তর্বিচষ্টে । পরাত্মনোর্যদ্ব্যবধানং...