আজ পরম কৃষ্ণভক্ত
শ্রীচৈতন্য ভারতীর আবির্ভাব তিথি। প্রেমের অবতার মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের দিব্যোন্মাদ-দশায় তাঁরই শ্রীমুখপদ্ম-বিনিঃসৃত এই "শিক্ষাষ্টক"।
চেতোদর্পণমার্জনং ভবমহাদাবাগ্নি-নির্বাপণং
শ্রেয়ঃকৈরবচন্দ্রিকা বিতরণং বিদ্যাবধূজীবনম্।
আনন্দাম্বুধিবর্দ্ধনং প্রতিপদং পূর্ণামৃতাস্বাদনং
সর্বাত্মস্নপনং পরং বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণসংকীর্তনম্।।১
ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নাম চিত্তরূপ দর্পণকে
মার্জন করে, জন্ম-মৃত্যুরূপ
সংসার-দাবানলকে নির্বাপণ করে। সন্ধ্যায় যেমন
চন্দ্রের শীতলজ্যোৎস্নায় কুমুদপুষ্প বিকশিত হয়, সেরূপ শ্রীকৃষ্ণনামরূপ
অমৃতধারায় হৃদয়-উল্লসিত হয় এবং শেষে
আত্মার অন্তর্নিহিত ভাব-সম্পদ কৃষ্ণপ্রেম
জাগ্রত হয়। সেই প্রেমামৃত
পুনঃ পুনঃ আস্বাদন করে
আত্মা প্রেমপারাবারে পরিপূর্ণ নিমজ্জিত হয়। আত্মার যাবতীয়
বিভাব পরিপূর্ণ সন্তোষ লাভ করে এবং
পবিত্র হয় এবং সর্বশেষে
শ্রীকৃষ্ণনামের প্রভাব বিজয় লাভ করে।
নাম্নামকারি বহুধা নিজসর্বশক্তি-
স্তত্রার্পিতা নিয়মিতঃ স্মরণে ন কালঃ।
এতাদৃশী তব কৃপা ভগবন্মমাপি
দুর্দৈবমীদৃশমিহাজনি নানুরাগঃ।।২
হে ভগবান্! তোমার
পবিত্র নাম সকলের উপর
কল্যাণ বর্ষণ করে। আর তোমার
কৃষ্ণ, গোবিন্দ প্রভৃতি অসংখ্য নাম আছে যার
মাধ্যমে তুমি নিজেকে প্রকাশ
করে থাক। তুমি দয়া
করে নিজের সর্বশক্তি ঐ নামের মধ্যেই
নিহিত করেছ। আর ঐ নামকীর্তনে
স্থান ও কালের কোন
নিয়ম রাখেন নি। তুমি অহৈতুকী
কৃপা করে নামরূপে অবতীর্ণ
হয়েছ। কিন্তু আমার এমনই দুর্দৈব,
সেই নামে আমার কোন
অনুরাগ হল না।
তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা।
অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ।।৩
যে সাধক তৃণ
হতেও সুনীচ, বৃক্ষের চেয়েও সহিষ্ণু, যে অপরকে যথাযথ
সম্মান দেয়, কিন্তু নিজে কারও কাছ
থেকে সম্মান চায় না, সেই-ই হরিনাম-কীর্তনের
যথার্থ অধিকারী।
ন ধনং ন
জনং ন সুন্দরীং
কবিতাং বা জগদীশঃ কাময়ে।
মম জন্মনি জন্মনীশ্বরে
ভবতাদ্ভক্তিরহৈতুকী ত্বয়ি।।৪
হে জগদীশ! আমি
ধন চাই না, অনুগামী
লোকজন চাই না, সুন্দরী
নারী, কাব্য কবিতা এসব কিছুই চাই
না। জন্মে জন্মে যেন তোমার ভক্তি
করতে পারি।
অয়ি নন্দতনুজ কিঙ্করং
পতিতং মাং বিষমে ভবাম্বুধৌ।
কৃপয়া তব পাদপঙ্কজ-
স্থিতধূলীসদৃশং বিচিন্তয়।।৫
হে নন্দতনুজ! আমি
তোমার নিত্য দাস। তথাপি আমি
নিজ কর্মদোষে এই জন্ম-মৃত্যুর
সংসার-সাগরে নিমজ্জিত হয়েছি। এই পতিতাধমকে তুমি
দাস বলে গ্রহণ কর
এবং তোমার শ্রীচরণের একটি ধূলিকণারূপে মনে
কর।
নয়নং গলদশ্রুধারয়া
বদনং গদ্গদ্রুদ্ধয়া গিরা।
পুলকৈর্নিচিতং বপুঃ কদা
তব নামগ্রহণে ভবিষ্যতি।।৬
হে নাথ! এমন
দিন কবে হবে— যখন
তোমার নামকীর্তন করতে করতে শ্রাবণের
বারিধারার মত আমার চোখের
জল নেমে আসবে। গলার
স্বর প্রেমানন্দে কাঁপবে, শরীরে রোমাঞ্চ হবে।
যুগায়িতং নিমেষেণ চক্ষুষা প্রাবৃষায়িতম্।
শূন্যায়িতং জগৎ সর্বং গোবিন্দবিরহেণ
মে।।৭
হে গোবিন্দ! তোমার
বিচ্ছেদে সমস্ত জগৎ শূন্য দেখছি।
বর্ষার বারিধারার মত আমি চোখের
জলে ভাসছি। তোমার বিরহে এক নিমেষও যুগের
মত মনে হয়।
আশ্লিষ্য বা পাদরতাং পিনষ্টু
মাম্
অদর্শনান্মর্মহতাং করোতু বা।
যথা তথা বা
বিদধাতু লম্পটো
মৎপ্রাণনাথস্তু স এব নাপরঃ।।
৮
শ্রীকৃষ্ণ আমায় ভালবেসে আলিঙ্গনই করুক, কিংবা তাঁর পদতলে পিষেই
ফেলুক, আমাকে দেখা না দিয়ে
আমার হৃদয়কে পুড়িয়ে ছারখারই করুক, সে লম্পট যা
ইচ্ছা তাঁর তাই করুক,
তথাপি তিনিই আমার প্রাণনাথ, আর
কেউ নয়।.…….
শ্রীশুভ চৌধুরী
দোল পূর্ণিমা, ২০২৪
খৃষ্টাব্দ।