যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞ আরম্ভ হইল। যুধিষ্ঠিরের সভার অর্ঘ দিতে হইবে—কে ইহার উপযুক্ত পাত্র? ভারতবর্ষীয় সমস্ত রাজগণ সভাস্থ হইয়াছেন, ইহার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কে? ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের এই প্রশ্নের উত্তরে-'ততো ভীষ্মঃ শান্তনবো বুদ্ধ্যা নিশ্চিত্য বীর্য্যবান্। অমন্যত তদা কৃষ্ণমহর্ণীয়তম্ ভূবি।।'-(মহাভারত, সভাপর্ব, ৩৫।২৭)
তারপর
বীর্য্যবান শান্তনুনন্দন ভীষ্ম বুদ্ধিদ্বারা নিশ্চয় করিয়া ভূমণ্ডলে শ্রীকৃষ্ণকেই পূজ্যতম
ব্যক্তি বলিয়া মনে করিলেন। ভীষ্ম বলিলেন, “কৃষ্ণই তেজঃ বল ও পরাক্রম বিষয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ।
ইঁহাকে অর্ঘ প্রদান কর।” ইনি জ্যোতিষ্কগণের মধ্যে ভাস্কর সদৃশ। ইঁহার উপস্থিতিতে
এই সভা আলোকিত হইয়াছে। ভীষ্ম বলিলেন, “এই মহতী নৃপসভায় একজন মহীপালও দৃষ্ট হয় না, যাহাকে
কৃষ্ণ তেজোবলে পরাজয় করেন না। অচ্যুত কেবল আমাদিগের অর্চনীয় এমত নহে, সেই মহাভুজ ত্রিলোকীর
পূজনীয়। তিনি যুদ্ধে অসংখ্য ক্ষত্রিয়বর্গের পরাজয় করিয়াছেন, এবং অখণ্ড ব্রহ্মাণ্ড তাঁহাতেই
প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। কৃষ্ণ জন্মিয়া অবধি যে সকল কার্য করিয়াছেন, লোকে মৎসন্নিধানে পুনঃ
পুনঃ তৎসমুদায় কীর্তন করিয়াছে। তিনি অত্যন্ত বালক হইলেও আমরা তাঁহার পরীক্ষা করিয়া
থাকি। কৃষ্ণের শৌর্য, বীর্য, কীর্তি ও বিজয় প্রভৃতি সমস্ত পরিজ্ঞাত হইয়া সেই ভূতসুখাবহ
জগদর্চিত অচ্যুতের পূজা বিধান করিয়াছি। কৃষ্ণের পূজ্যতা বিষয়ে দুটি হেতু আছে; তিনি
নিখিল বেদবেদাঙ্গ—পারদর্শী ও সমধিক বলশালী। ফলতঃ মনুষ্যলোকে তাদৃশ
বলবান্ এবং বেদবেদাঙ্গসম্পন্ন দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রত্যক্ষ হওয়া সুকঠিন। দান, দাক্ষ্য,
শ্রুত, শৌর্য, লজ্জা, কীর্তি, বুদ্ধি, বিনয়, অনুপম শ্রী, ধৈর্য ও সন্তোষ প্রভৃতি সমুদায়
গুণাবলী কৃষ্ণে নিয়ত বিরাজিত রহিয়াছে। অতএব সেই সর্বগুণসম্পন্ন আচার্য, পিতা ও গুরুস্বরূপ
পূজার্হকৃষ্ণের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন তোমাদের সর্বতোভাবে কর্তব্য তিনি ঋত্বিক্, গুরু,
সম্বন্ধী, স্নাতক, রাজা এবং প্রিয়পাত্র। এই নিমিত্ত অচ্যুত অর্চিত হইয়াছেন। কৃষ্ণই
এই চরাচর বিশ্বের সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়কর্তা, তিনিই অব্যক্ত প্রকৃতি, সনাতন, কর্তা,
এবং সর্বভূতের অধীশ্বর, সুতরাং পরমপূজনীয়, তাহাতে আর সন্দেহ কি? বুদ্ধি, মন, মহত্ত্ব,
পৃথিব্যাদি পঞ্চ ভূত, সমুদায়ই একমাত্র কৃষ্ণে প্রতিষ্ঠিত আছে। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ,
নক্ষত্র, দিক্বিদিক্ সমুদায়ই একমাত্র কৃষ্ণে প্রতিষ্ঠিত আছে।”
ভীষ্মের
অনুমতিক্রমে সহদেব ভগবান শ্রীকৃষ্ণকেই শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য প্রদান করিলেন।

No comments:
Post a Comment