শ্রীগুরু কৈবল্যনাথ শ্রীশ্রীরামঠাকুর বলিতেছেন— বিশাল জলধিতীরে "অপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা, পশ্যত্যচক্ষুঃ স শৃণোত্যকর্ণঃ"—(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-৩/১৯) শ্রীশ্রীপুরুষোত্তম জগন্নাথ বিরাজিত। তিনি হস্ত ও পদশূন্য হইয়াও বেগবান বা সচল ও গ্রহীতা, চক্ষুহীন হইয়াও দর্শন করেন, কর্ণহীন হইয়াও শ্রবণ করেন। উৎকলে তিনি দারুব্রহ্ম নামেই খ্যাত। তাঁকেই আবার আদর করিয়া ডাকা হয় "নীলাচলের নীলমাধব।"
জানেন
তো শ্রীশ্রীজগন্নাথ প্রভুর মন্দিরে প্রতিদিন ভোগ হয় ছাপ্পান্নটা
এবং ছত্রিশ প্রকার ব্যঞ্জন দ্বারা পরিবেশন করা হয়। প্রতি
ভোগে তুলসী পত্র দিয়া অর্পণ
না করিলে প্রভু তাহা গ্রহণ করেন
না। তাই বৈষ্ণব মহাজন
বাক্যে এইরূপ উক্ত হইয়াছে—
ছাপ্পান্ন
ভোগ ছত্রিশ ব্যঞ্জন
বিনা
তুলসী হরি এক না
মানই।
শ্রীক্ষেত্রে
রথযাত্রা উৎসবই প্রধান। সহস্র সহস্র নরনারী পুরুষোত্তম জগন্নাথদেবকে দর্শন করার জন্য প্রতিবৎসরই
ছুটিয়া যায়। এই ছুটিয়া যাওয়ার
পিছনে আছে পুনর্জন্ম রহিত
হওয়ার বাণী—"রথে তু বামনং
দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।" এই
যে পরম মহিমাময় বিশ্ব
বিশ্রুত দেবতা শ্রীশ্রীজগন্নাথদেব তাহার সম্বন্ধে বাহির হইতে আমরা যা
দেখিতেছি তাহার পিছনে কি অন্তর্নিহিত জিনিস
রহিয়াছে খুঁজিয়া দেখা দরকার। মূর্তি
তো ভাবেরই প্রকাশ স্থূলেতে। কেহ যদি জিজ্ঞাসা
করেন যে এই জগন্নাথদেবের
আকার কিরূপ তাহার কিন্তু কোন প্রীতিপ্রদ উত্তর
দিতে পারা যায় না।
কারণ বর্ণনাযোগ্য হস্তপদাদি কোন আকারই যেন
তাঁহার নাই, অথচ আকারবানও
বটে। এমন অসামঞ্জস্যরূপ তো
কোন মূর্তিতে দেখা যায় না।
ব্রহ্ম সাকার অথচ নিরাকার, সগুণ
অথচ নির্গুণ অর্থাৎ পরস্পর বিরুদ্ধ বিভাগের সমন্বয়। ব্রহ্মের স্বরূপ বর্ণনা করিতে গিয়া ভগবান্ গীতাতে এভাবে আভাস দিয়াছেন—
সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং
সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্৷
অসক্তং
সর্বভৃচ্চৈব নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ৷৷
-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৩/১৫)
—তিনি চক্ষুরাদি
সমুদয় ইন্দ্রিয় বৃত্তিতে প্রকাশমান অথচ সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিত, নিঃসঙ্গ অর্থাৎ
সর্বসঙ্গশূন্য অথচ সকলের আধারস্বরূপ,
নির্গুণ অথচ সত্ত্বাদি-গুণের
ভোক্তা। তাঁহার স্বরূপই এই, তাই জগন্নাথদেবে
ইহা যুগপৎ বর্তমান। শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের মধ্যে সাকার অথচ নিরাকার, নিরাকার
অথচ সাকার— এই মূল তত্ত্বেরই
আভাস পাই।
ত্রিমূর্তিতে
সৎ, চিৎ, আনন্দস্বরূপ জগন্নাথ,
সুভদ্রা ও বলরাম মূর্তি।
বিশাল জলধিতীরে নীলাচল শিখরে অবস্থিত সুরম্য প্রাসাদ মধ্যে জগন্নাথদেব, মধ্যভাগে সুভদ্রা ও দক্ষিণে সহোদর
বলভদ্রের সহিত আসীন। বলভদ্ররূপে
তিনি চিৎ প্রকাশ, এইহেতু
শ্বেতবর্ণ। বলভদ্রের এক নাম সঙ্কর্ষণ,
যেহেতু তিনি জীবকে সম্যক
প্রকারে আকর্ষণ করেন। দেবী সুভদ্রা আনন্দের
প্রতীক। 'সু' অর্থ উত্তম,
ভদ্র অর্থ মঙ্গল। আনন্দই
সর্বোৎকৃষ্ট মঙ্গল, তাই সুভদ্রা নামে
আখ্যাতা। জগন্নাথদেবের কান্তি জলপূর্ণ মেঘের ন্যায় শ্যামল। যেহেতু তাঁহার সবিশেষ কোন বর্ণ নাই,
তাই শ্যামল প্রতিভাত হয় যাহা অনন্তেরই
প্রতীক। আকাশের নিজস্ব কোন রং নাই
তবু নীলবর্ণ। জীব হৃদয়ে তাঁহাকে
জানিবার আকাঙ্ক্ষা যখন প্রবল হয়,
তখন তিনি তাহাদের অন্তরে
বৈরাগ্য উৎপাদন করিয়া বিশাল মায়া জলধি অতিক্রম করাইয়া
বিশ্বাতীত স্বরূপ দান করেন। তখন
ভক্ত ও ভগবান এক
রস। কে কার পূজা
অর্চনা করিবে, তাই শুধু দর্শন
আর ভোগ।
তৎপর
শ্রীশ্রীঠাকুর বৈষ্ণব মহাজন পদটির এইরূপ বিশ্লেষণ দিলেন—
ভোগ
৫৬ টা যথাঃ-
পঞ্চভূত—ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ
ও ব্যোম।
পঞ্চতন্মাত্র—গন্ধ, রস, রূপ, স্পর্শ,
শব্দ।
দশ
ইন্দ্রিয়—পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, বাক্,
পাণি, পাদ, পায়ু, উপস্থ।
পঞ্চ
জ্ঞানেন্দ্রিয়—চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক্।
ছয়
ঐশ্বর্য্য—ঐশ্বর্য্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান,
বৈরাগ্য।
ছয়
প্রপঞ্চ—প্রপঞ্চ, ভুবন, মূর্তি, মন্ত্র, দেবতা, মাতর।
ছয়
রিপু—কাম, ক্রোধ, লোভ,
মোহ, মদ, মাৎসর্য্য।
ছয়
ভোগ—ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা, আলস্য, ভয়, শোক।
ছয়
দণ্ড—জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি, দুঃখ,
দণ্ড।
ছয়
অহঙ্কার—অহঙ্কার, অভিমান, দম্ভ, দর্প, পারুষ্য, গর্ব।
ছাপ্পান্ন
ভোগ ত্যাগ হইলেই এক হয়। ভোগমুক্ত
হইলেই মুক্তি। তৌল দ্বারা দুইপক্ষ
সমান হইলেই ভোগমুক্তি হয়। শ্রীভগবান গীতায়
দ্বিতীয় অধ্যায়ে সমাধিস্থ স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ বর্ণনা করিয়া সম্যক অবস্থাকে "ব্রাহ্মীস্থিতি" আখ্যা দিয়াছেন। সমাধি অর্থ চিত্তের সমাধানের
স্থিতি। সমাধান অর্থ সমতুলন। দাঁড়ির
দু পাল্লা ঠিক সমান হইলে
বলা হয় দাঁড়ি সমতুল
হইয়াছে। চিত্তের স্থিতি তুলাদন্ডের মতো সমতুল, অচল,
শান্ত। পরে ষষ্ঠ অধ্যায়ে
স্থিতির তুলনা করা হইয়াছে বায়ু
শূন্য স্থানের কম্পহীন দীপশিখার সঙ্গে। অন্তঃকরণে কোন বিষয়কার বৃত্তি
অর্থাৎ চিন্তার উদয় না হইলেই
উহা নিশ্চল থাকে এবং সদাই
নিশ্চলভাবে আত্মাতে অবস্থিতি করে।
৩৬
ব্যঞ্জন —চতুর্বেদ, চতুর্দ্দশ শাস্ত্র, অষ্টাদশ মর্ম (নামের মধ্যে সবই আছে) ।
তুলসী
—এটা বেশী, ওটা কম, এই
দুইটা সমান হইলে মুক্তি।
এ জন্যই তুলসীপত্র না হইলে নারায়ণ
ভোগ গ্রহণ করেন না। ভোগ
থাকিলেই যোগ কমিয়ে যায়,
ভোগ ত্যাগ হইয়া গেলেই শান্তি। তাই গীতায় স্থিতপ্রজ্ঞ,
গুণাতীত ও ভক্তের অবস্থা।
সকলের একই লক্ষণ। এ
অবস্থায়ই অহং বুদ্ধির লোপ
হয়। এই যে ভাব
তাহা অনির্বচনীয়।
ঠাকুর
ভক্ত সমাবেশে কয়েক ঘন্টাব্যাপী অক্লান্তসুরে উপদেশামৃত বর্ষণ করিতেন। সুদীর্ঘ সেই উপদেশ থেকে
সুনির্বাচিত রত্নসাদৃশ্য বহু উদ্ধৃতিই ভক্তদের
গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে দেওয়া যাইতে পারে। কিন্তু দীর্ঘকালীন উপদেশ হুবহু লেখা কাহারও পক্ষেই
সম্ভব নহে। একথা তো
ঠাকুরই বলিয়াছেন— ''প্রজাপতি বলিয়াছেন আর ব্যাসদেব লিখিয়াছেন,
আর কেহই লিখিতে পারে
নাই"।
তথ্যসূত্রঃ-
১.
পুরীধাম শ্রীক্ষেত্রঃ "শ্রীশ্রীরামঠাকুর কথামৃত", বিন্দু, পৃষ্ঠা ৩৫, শ্রীব্রজেন্দ্র কুমার
চৌধুরী।
২.
সত্যধাম থেকে প্রকাশিত "ক্রন্দসী"
শীর্ষক গ্রন্থ, শ্রীমতী প্রমীলা দত্ত।
শ্রীশুভ
চৌধুরী
জুন
২২, শনিবার, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।
জগন্নাথদেবের
স্নানযাত্রা।

No comments:
Post a Comment