নিরালম্বের ধ্যান বা চিন্তা বড়ই কঠিন। কোন কিছু চিন্তা করতে গেলে অবশ্যই একটা অবলম্বনের প্রয়োজন। ভগবান্ উত্তর গীতায় বলেছেন—
ঊর্ধ্বপূর্ণমধঃপূর্ণং
মধ্যপূর্ণং যদাত্মকম্ ।
সর্বপূর্ণং
স আত্মেতি সমাধিস্থস্য লক্ষণম্ ॥
— যার ঊর্ধ্ব
পূর্ণ, অধঃ পূর্ণ, মধ্য পূর্ণ অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডের সর্বস্থানেই যিনি পরিপূর্ণ, তিনিই আত্মা। যে যোগী এইভাবে
তাঁকে চিন্তা করেন, তিনি তাতেই সমাহিত হয়ে যান; তাঁর মধ্যে সমাধির লক্ষণ দেখা দেয়।
তখন
অর্জুন ভগবানকে পুনরায় প্রশ্ন করলেন, ভগবান্! আপনি যা বললেন, তাতে
তো অবলম্বনের কথা এসে পড়ল। অবলম্বন মানেই তো অনিত্য, নশ্বর,
বিনাশশীল। আত্মা বা পরব্রহ্ম তো
আর বিনাশীল নন, আবার তিনি অস্তিত্বহীন শূন্যপদার্থও নন। তাহলে যিনি নশ্বরও নন, আবার শূন্যও নন, যোগীরা কিভাবে তাঁকে ধ্যান করবেন?
শ্রীভগবানুবাচ-
হৃদয়ং
নির্মলং কৃত্বা চিন্তয়িত্বাপ্যনাময়ম্ ।
অহমেব
ইদং সর্বমিতি পশ্যেৎপরং সুখম্ ॥
শ্রীভগবান্
বললেন—হৃদয়কে নির্মল করে অর্থাৎ সংসারে থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবে যে রাগ, দ্বেষ,
কামনা-বাসনা এসে চিত্তকে কলুষিত করে, হৃদয়কে সংকীর্ণ করে, সেগুলো পরিহার করে, তা থেকে হৃদয়কে
সংকীর্ণতা-মুক্ত এবং শুদ্ধ করে সেই অনাময়কে (নিত্য-শুদ্ধ-বুদ্ধকে) যোগীরা চিন্তা করবেন। তাঁর সেই চিন্তার পরিসর হবে এইরকম—আমি বিচ্ছিন্ন কোন সত্তা নই। স্থাবর-জঙ্গম প্রভৃতি নানা অস্তিত্ব নিয়ে এই যে বিশ্ব,
আমিই সেই অখণ্ড বিশ্ব। এইভাবে যোগী যখন আপন সত্তাকে নিখিল বিশ্বরূপে দেখবেন তখনই যোগযুক্ত হয়ে তিনি সুখী হবেন অর্থাৎ ব্রহ্মানন্দ লাভ করবেন।
পুরুষোত্তম ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে উপনিষদের সেই মর্মকথাটিই বলেছেন। ধ্যান করবে সেই বৃহৎ মনের, ধ্যান করবে 'অহং ব্রহ্মেতি'—আমিই ব্রহ্ম; 'অহমিত্যক্ষরং ব্রহ্ম'—আমিই অক্ষরব্রহ্ম; 'অহমেকমিদং সর্বমিতি'— আমিই এই অখিল ব্রহ্মাণ্ড। এভাবেই যোগী অপরোক্ষানুভব প্রাপ্ত হয়। পরমহংস পরিব্রাজকাচার্য গৌড়পাদাচার্য এই শ্লোকের ভাষ্যে বলেছেন—"হৃদয়ং চিত্তং নির্মলং জ্ঞানবিরোধিরাগাদিদোষরহিতং কৃত্বা অনাময়ং চিন্তয়িত্বা ঈশ্বরং ধ্যাত্বা পরং সুখী সন্ এক এবাহমিদং সর্বং জগজ্জালমহমেব ন মত্তো ব্যতিরিক্তমন্যৎ ইতি পশ্যেৎ অপরোক্ষানুভবং প্রাপ্নুয়াৎ ইত্যর্থঃ॥"
—("উত্তরগীতা", প্রথম অধ্যায়, ৩৫-৩৮)
শ্রীশুভ
চৌধুরী
আগস্ট
২৯, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।
.jpg)
No comments:
Post a Comment