পাতঞ্জল যোগসূত্রের সমাধিপাদে বর্ণিত আছে-
তস্য
বাচকঃ প্রণবঃ ।।২৭।।
-প্রণব অর্থাৎ ওঙ্কার তাঁহার প্রকাশক শব্দ।
ব্যাসভাষ্যানুবাদঃ-ঈশ্বর
প্রণবের বাচ্য বা বোধ্য।এই বাচ্যবাচকত্ব সম্বন্ধ কি সংকেত কৃত অথবা প্রদীপের প্রকাশের
ন্যায় অবস্থিতি? এভাবে বাচ্যের ঈশ্বরের বাচকের তথা প্রণবের সঙ্গে সম্বন্ধ রয়েছে। ঈশ্বরের
সংকেত কিন্তু এই শব্দে থাকা অর্থকেই প্রকাশ করে। যেমন পিতা পুত্রের সম্বন্ধ সংকেত দ্বারা,
এদের শব্দ ও শব্দগত অর্থ দ্বারা প্রকাশ পায়। যেমন ইনি এঁর পিতা, ইনি এঁর পুত্র,সেভাবে।
অন্যান্য উৎপন্ন বস্তুগুলিতেও এই বাচ্য-বাচক শক্তি সাপেক্ষ সম্বন্ধ রয়েছে। সদৃশ ব্যবহার
পরম্পরায় নিত্যত্বহেতু শব্দার্থের সম্বন্ধও নিত্য, একথা শাস্ত্রবিদরা বলে থাকেন।
স্বামী বিবেকানন্দের ব্যাখ্যাঃ-সূত্রকার বলিতেছেন, ‘ওঙ্কার ঈশ্বরের বাচক’। কেন তিনি এই শব্দটির উপর জোর দিলেন? ‘ঈশ্বর’ ভাবটি বুঝাইবার জন্য তো শত শত শব্দ রহিয়াছে। একটি ভাবের সহিত সহস্র সহস্র শব্দের সম্বন্ধ থাকে। ঈশ্বর-ভাবটি শত শত শব্দের সহিত সম্বন্ধ রহিয়াছে, উহার প্রত্যকটিই তো ঈশ্বরের বাচক। বেশ কথা, কিন্তু তাহা হইলেও ঐ শব্দগুলির মধ্যে একটি সাধারণ শব্দ বাহির করা চাই। ঐ বাচকগুলির একটি সাধারণ অধিষ্ঠান-সাধারণ শব্দ-ভূমি বাহির করিতে হইবে, আর যে বাচক শব্দটি সাধারণ বাচক হইবে, সেই শব্দটিই সর্বশেষ্ঠ বলিয়া পরিগণিত হইবে, আর সেইটিই সকলের প্রতিনিধিরূপে উহার যথার্থ বাচক হইবে। কোন শব্দ উচ্চারণ করিতে হইলে আমরা কন্ঠনালী ও তালুকে শব্দোচ্চারণের আধাররূপে ব্যাবহার করিয়া থাকি। এমন কি কোন শব্দ আছে, অপর সমুদয় শব্দ যাহার প্রকাশ, যাহা সর্বাপেক্ষা স্বাভাবিক শব্দ?-‘ওঁ’ (অউম্) এই প্রকার শব্দ; উহাই সমুদয় শব্দের ভিত্তি-স্বরূপ। উহার প্রথম অক্ষর ‘অ’ সমুদয় শব্দের মূল-উহাই সমুদয় শব্দের কুঞ্চিকাস্বরূপ, উহা জিহ্বা অথবা তালুর কোন অংশ স্পর্শ না করিয়াই উচ্চারিত হয়। ‘ম’-বর্গীয় শব্দের শেষ শব্দ, উহার উচ্চারণ করিতে হইলে ওষ্ঠদ্বয় বন্ধ করিতে হয়। আর ‘উ’ এই শব্দ জিহ্বামূল হইতে মুখ-মধ্যবর্তী শব্দাধারের শেষ সীমা পর্যন্ত যেন গড়াইয়া যাইতেছে। এইরূপে ‘ওঁ’ শব্দটি দ্বারা সমুদয় শব্দোচ্চারণ-ব্যাপারটি প্রকাশিত হইতেছে। এই কারণে উহাই স্বাভাবিক বাচক শব্দ-উহাই ভিন্ন ভিন্ন শব্দের জননী-স্বরূপ। যত প্রকার শব্দ উচ্চারিত হইতে পারে-আমাদের ক্ষমতায় যত প্রকার শব্দ-উচ্চারণের সম্ভাবনা আছে, উহা সেই সকলেরই সূচক।

No comments:
Post a Comment